• E-paper
  • English Version
  • রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:২২ পূর্বাহ্ন

করোনা পরিস্থিতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, পুস্তক ব্যবসায়ীদের জীবন জীবিকা পাল্টে যাচ্ছে

রনজিৎ বর্মন (শ্যামনগর) সাতক্ষীরা
  • আপডেটের সময় সোমবার ১২ জুলাই, ২০২১

“নিজের বসত ভিটার পুরনো রেইনট্রি গাছ বিক্রী করে ব্যাংক ঋণের কিস্তী পরিশোধ করা হচ্ছে, ইতিমধ্যে বাড়ীর একটি গরু বিক্রী করতে বাধ্য হয়েছি, বইয়ের ব্যবসা পরিচালনা করার জন্য স্থানীয় ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ করেছিলাম। করোনার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্টান বন্ধ, ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করা কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে”। এমন সব কথা বলছিলেন সুন্দরবন উপকুলীয় সাতক্ষীরা জেলার শ্যামনগর উপজেলার পুস্তক ব্যবসায়ী ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরীর কর্ণধর শেখ ছামিউল ইসলাম। তিনি বলেন ব্যবসা পরিচালনার জন্য ব্যাংক থেকে প্রায় ১৫ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে ছিলাম। কঠোর লকডাউন ও স্কুল কলেজ বন্ধ থাকায় বই ব্যবসা নিভে যেতে বসেছে। এমন অবস্থায় পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কষ্ট কর হয়ে পড়েছে।

কোভিড-১৯ এর প্রকোপে প্রায় দেড় বছর স্কুল কলেজ সহ সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্টান বন্ধ থাকায় শ্যামনগর উপজেলা ব্যাপী পুস্তক ব্যবসায়ীদের জীবন জীবিকা পাল্টে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। অনেক পুস্তক ব্যবসায়ী বই ব্যবসা পরিবর্তন করে অন্য ব্যবসা শুরু করেছেন, কেউবা বাড়ীতেই জীবন যাপন করছেন। বড় পুস্তক ব্যবসায়ী অনেকেই কোভিড-১৯ এ ব্যবসা প্রতিষ্টান বন্ধ থাকায় কর্মচারী ছেড়ে দিয়েছেন। ফলে এ সকল কর্মচারী অনেকেই কর্মহীন হওয়ার কারণে বাড়ীতে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।

শ্যামনগর ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরীর মালিক শেখ ছামিউল ইসলাম বলেন করোনার প্রকোপের প্রথম দিকে ভেবেছিলেন খুব শীঘ্র এটি কেটে যাবে শিক্ষা প্রতিষ্টান খুলে যাবে, ব্যবসা চলবে। কয়েক মাস পর আরও প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবসা প্রতিষ্টান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় ২০২০ সালের জুন মাসে এক জন কর্মচারী ছেড়ে দেন এর এক মাস পর আবার আরও এক জন কর্মচারী কর্মচারী ছেড়ে দেন। এক জনের বেতন ছিল ৭ হাজার টাকা, অপর কর্মচারীর বেতন ছিল ৫ হাজার টাকা। তিনি বলেন তার দোকানের এক জন কর্মচারী বেকার জীবন যাপন করছেন আর এক জন অন্য একটি ছোট কাজের সাথে যুক্ত হয়েছেন।

শেখ ছামিউল ইসলাম বলেন করোনা যখন ছিল না সে সময়ে দৈনিক সর্বোচ্চ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকার বই বিক্রী করেছেন। করোনার প্রকোপকালিন সময়ে দৈনিক ৫০ থেকে ৮শত টাকার বই বিক্রী হচ্ছে। আবার কোন কোন দিন বই বিক্রী হচ্ছেনা। যে বই গুলি বিক্রী হচ্ছে সে গুলি ধর্মীয় সহ অন্যান্য বই। তিনি বলেন তার কাছ থেকে বিভিন্ন এলাকার ছোট ছোট পুস্তক ব্যবসায়ীরা বই নিয়ে বাকীতে ব্যবসা করত কিন্ত করোনার কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এ সকল ব্যবসায়ীরা ঠিক মত টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না।

শ্যামনগর উপজেলা সদরের পুরানো বই ব্যবসায়ী পল্লী মঙ্গল লাইব্রেরীর মালিক উৎপল মন্ডল বলেন বিভিন্ন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বই ব্যবসা পরিচালনা করছি। প্রতিমাসে ঘর ভাড়া পরিশোধ করতে হয় প্রায় ৬ হাজার। এনজিও থেকে ঋণ গ্রহণ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। ঋণের টাকা পরিশোধ করতে তিনি গরু বিক্রী করেছেন। দোকানে ১ জন কর্মচারী ছিল, যার বেতন ছিল মাসিক ৪ হাজার টাকা। ২০২০ সালে করোনা প্রকোপ শুরু হলে পরপরই কর্মচারী ছেড়ে দেন। তিনি বলেন বর্তমানে তার দোকানের কর্মচারী বেকার জীবন যাপন করছেন। বই বিক্রী ও ব্যবসা প্রতিষ্টান বন্ধ থাকায় ঋণ পরিশোধ করা ও পরিবারের খরচ চালানো কষ্ট সাধ্য হয়ে পড়েছে।

শ্যামনগর উপজেলা সদরের বড় পুস্তক ব্যবসায়ী রোকন বুক ডিপোর মালিক রোকন বলেন করোনার প্রকোপ শুরু থেকে অদ্যবধী ব্যবসা এক রকম বন্ধ আছে। করোনার পূর্বে দৈনিক সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকার বই বিক্রয় হলেও এখন ৫ থেকে ৭ শত টাকা বই বিক্রী বড় কষ্ট কর। মাসে ঘর ভাড়া ২০ হাজার টাকা , কর্মচারীর বেতন , ব্য্ংাক ঋণ, মহাজনের টাকা এ সব চালাতে হিমসিম খেতে হচ্ছে। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যাংক ঋণ, মহাজনের টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে বলে জানান। তিনি বলেন তিন জন কর্মচারীর মধ্যে দুই জন কর্মচারী ছেড়ে দিয়েছেন ব্যবসা চলছে না বলে। কর্মচারী দুই জনের বেতন ছিল ৮ হাজার টাকা। বর্তমানে তারা বাড়ীতে বেকার দিন যাপন করছেন।

রোকন বুক ডিপোর মালিক বলেন তার কাছ থেকে শ্যামনগর ও কালিগঞ্জ উপজেলার ছোট ব্যবসায়ীরা বই নিয়ে বিক্রী করতেন। যেমন মুন্সিগঞ্জ ইভা বুক সেন্টার, হরিনগর বনফুল বই বিতান, নওয়াবেঁকী সুন্দরবন বুক ডিপো সহ অন্যান্যরা পাইকারীভাবে বই নিয়ে নিজেদের দোকানে বই বিক্রী করতেন। ছোট অনেক ব্যবসায়ী বই বিক্রী বন্ধ থাকায় টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না। এ সকল ব্যবসায়ীদের কাছে তিনি ১৫ থেকে ২০ লক্ষ টাকা পাবেন বলে জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ীর নাম বলেন যিনি বই ব্যবসা ছেড়ে ইজি বাইক চালানো শুরু করেছেন। তার ৫/৬ থেকে লক্ষ টাকার বই নষ্ট হয়েছে বলে জানান। বর্তমানে যে বই গুলি মাঝে মাঝে বিক্রী হচ্ছে সেটি চাকুরী সংক্রান্ত । কিছু কলেজের শিক্ষার্থীর বইও মাঝে মাঝে বিক্রী হচ্ছে।

শ্যামনগরে আল্লারদান লাইব্রেরীর মালিক বলেন বই বিক্রী বন্ধ হাত,পা গুটিয়ে বসে আছি। ধর্মীয় বই বিক্রী করছি কোন কোন সময়ে।

শ্যামনগর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ২২ জন পুস্তক ব্যবসায়ী আছেন বলে জানা যায়। এ সকল লাইব্রেরীতে করোনার পূর্বে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকবৃন্দ, অভিভাবকবৃন্দ আসা যাওয়া করতেন। বর্তমানে সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবক , শিক্ষক, শিক্ষার্থীদের পদচারণা নাই বলে ব্যবসায়ীরা জানান। ব্যবসায়ীরা জানান অনেক সময় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা লাইব্রেরীতে এসে অনেক বই পড়ে বা নোট করে নিয়ে যেতেন। তারা আরও বলেন সরকার প্রাথমিকে, মাধ্যমিকে, মাদ্রাসায় পাঠ্য বই বিনা মূল্যে সরবরাহ করছে বিধায় শিক্ষার্থীদের বাজার লাইব্রেরীতে বা বই বিক্রী দোকানে আসা যাওয়া নাই বললে চলে। চাকুরী সংক্রান্ত, ধর্মীয় বই, গল্প, উপন্যাস,জীবনী. নাটক ,ভ্রমণ সহ অন্যান্য বই ক্রয়ের জন্য বই পিপাসু মানুষের অনাগোনাও কমে গেছে কোভিড-১৯ এর জন্য। ব্যবসায়ীবৃন্দ অপেক্ষায় আছেন কবে সেই সুদিন আসবে যে দিন আবার করোনার পূর্বের মত ব্যবসা প্রতিষ্টান খুলে রেখে বই বিক্রী করবেন।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর