• E-paper
  • English Version
  • বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৩:১৩ পূর্বাহ্ন

গ্রামীণ জনপদের কার্তিক সংক্রান্তি ও নবান্ন

ড. সুভাষ চন্দ্র দেব
  • আপডেটের সময় শুক্রবার ১৯ নভেম্বর, ২০২১

গ্রামগুলোতে এক সময় ছিলো বারো মাসে তেরো পার্বণ, ছিলো নানা লৌকিকতা। সময়ের পরিক্রমায় এর অনেক কিছুই বিলুপ্তির পথে। নতুন প্রজন্মের কাছে এসব এখন মূল্যহীন, ফলে একে একে হারতে বসেছে গ্রাম বাংলার লোকজ উৎসবগুলো।

বিজ্ঞাপন

গ্রামে কার্তিকের শেষ দিনে হিন্দু বাড়িগুলোতে ধোয়ামোছা চলতো দিনভর। সকল ঘরদুয়ার পরিষ্কার থেকে শুরু করে গরু ছাগলকেও স্নান করানো হতো। গ্রামে বলতো ‘প্রেত কার্তিকের শেষ’। এদিন ঘরে ঘরে হতো কার্তিক পুজো। মহিলারা কার্তিক ঠাকুরের মতো সুপুরুষ পুত্রের আশায় ও মঙ্গল কামনায় উপবাস থেকে পুজো দিতেন। ক’দিন আগ থেকেই কুমোররা পুজোর মুর্তি ও মাটির ঘটিবাটি সামগ্রী ফেরী করতেন বাড়ী বাড়ী। বৈষ্ণব মতাবলম্বীগন কার্তিক মাসকে নিয়ম মাস মেনে নিরামিষ খেতেন এবং শেষদিনে পূজা দিয়ে এক মাসের ব্রত শেষ করতেন।
বিকেলে গ্রামের ছেলেরা খড় দিয়ে ভূতের কুশপুত্তলি বানিয়ে এর গলায় মশা মাছি, পোকামাকড়ের মালা ঝুলিয়ে দিত, তারপর সন্ধায় বাড়ীর বাইরে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলত। এটাকে বলা হতো ভোলা পুড়ানো। গ্রামে বিশ্বাস করতো ভূত পোড়ানোর মধ্যদিয়ে রোগশোক, মশা-মাছির বিনাশ হবে। এর সাথে ছিলো আরো নানাবিধ লৌকিকতা। বাড়ি বাড়ি গিয়ে কলার ডালের বারি দিয়ে বলা হতো-
 “ভোলা ছাড় ভুলি ছাড়,
বারো মাইয়া পিছা ছাড়…”।
এদিন রাতে গ্রামের বাড়িগুলোতে বনভোজনের মতো রান্নাবান্না করে খাওয়া হতো, গানের অনুষ্ঠানের আয়োজনও করতেন কেউ কেউ।
পরের দিন পহেলা অগ্রহায়ণ। পালন করা হতো নবান্ন।
অগ্রহায়ণের প্রথম দিন মা, ঠাকুরমারা নতুন ধানের চাল দিয়ে নৈবদ্য সাজিয়ে, পিঠাপুলি দিয়ে পুজো দিতেন। দুপুরে হতো নতুন চালের ভাত ও নানাবিধ তরকারী।  প্রায় ছ’মাস আউশ চালের পর সাদা মোলায়েম আমন চালের ভাত ছিল অসাধারণ। গ্রাম জুড়ে চলতো অভাব অনটনহীন উৎসবের আমেজ।
গ্রামগুলি এখন আর আগের মত নেই। উৎসব আনন্দের উপলক্ষ আর অনুষঙ্গ বদলেছে। গ্লোবালাইজেশন গিলে খাচ্ছে হাজার বছরের লোকজ ঐত্যিহ্য। সোনাফলা বিস্তীর্ণ  মাঠ জুড়ে গড়ে উঠেছে ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন। লাঙল ফেলে স্বনির্ভর কৃষক হচ্ছেন বেতনভোগী শ্রমিক। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে উঁচু জমিতে গড়ে উঠছে নতুন বাড়ী যেন সবুজের গায়ে এক একটি টিউমার হয়ে।
জানি হেমন্তের সেইদিন,  সেই সোনাঝরা বিকেল আর ফিরবেনা কোনোদিনও,  তবু বলি–
“দাও ফিরে সে অরণ্য, লও এ নগর, লও যত লৌহ লোষ্ট্র কাষ্ঠ ও প্রস্তর হে নবসভ্যতা!
হে নিষ্ঠুর সর্বগ্রাসী, দাও সেই তপোবন …”


লেখক; সহকারী অধ্যাপক
বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর