• E-paper
  • English Version
  • বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:২১ পূর্বাহ্ন

বই কিনি, বই পড়ি || জেবুন্নেছা জোৎস্না

লেখক; কবি ও গল্পকার
  • আপডেটের সময় রবিবার ৭ নভেম্বর, ২০২১

কোভিডের তীব্র আতংক একটু কাটিয়ে উঠতেই, ‘বই আমার শক্তি, বই আমার মুক্তি’ স্লোগানে অনুষ্ঠীত হয়ে গেল মুক্তধারা আয়োজিত ৩০তম নিউইয়র্ক বাংলা বইমেলা। বাংলাদেশ এবং কলকাতার বাহিরে এটিই বেশ বড় এবং জমজমাট বইমেলা। আটলান্টিকের দুরত্ব অতিক্রম করে বাংলাদেশ এবং সমগ্র আমেরিকার বিভিন্ন স্টেট থেকে আগত প্রকাশক, সাহিত্যপ্রেমী, কবি-লেখক – পাঠকদের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহনের মাধ্যমে পাঁচদিনের এই পুর্নমিলন বাংলা সাহিত্যের মাইলফলকে রেখে গেছে বাঙ্গালীর সাহিত্য সুধা-মুগ্ধতার স্বাক্ষর। এমন উচ্ছাসপূর্ণ দিন, দেখিনি বহুদিন। মুক্তধারার কর্ণধার বিশ্বজিৎদা বলেন, আপনারা আনন্দ করুন তো!! আমরা এতো আনন্দ করেছি আর হুড়মুড়িয়ে বই কিনেছি যা হয়তো শাড়ী-গয়না কেনাকেও হার মানায়! বইমেলাকে কেন্দ্র করে নিউইর্য়কের বাঙ্গালী অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটস বাংলাভাষীদের নিয়ে এসেছে একই বৃত্তে; যা আমাদের মানুষ হতে ধীরে ধীরে পাঠক, অথবা লেখক মানুষে রুপান্তরিত করছে, আর এর সবটুকু অবদান শ্রদ্ধেয় বিশ্বজিৎ সাহা দাদার। তিনি মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা

বিজ্ঞাপন


এবং নিভৃতে ১৯৯২ সাল থেকে দুই বাংলা সহ বাংলাভাষী অভিবাসী স্রোতকে একত্রিত করে প্রবাসেও উজ্জ্বীবিত করে রেখেছেন বাংলার সাহিত্য- সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং চেতনাকে। আর এই ঐতিহ্যবাহী বইমেলার সাথে অভিবাসী বাঙ্গালীরাও সুযোগ পেল যথাযোগ্য মর্যাদায় বাংলাদেশের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করতে। প্রতিটি বাংলাদেশী নাগরিকের এ বড় গর্বের বিষয়, যারা দূরে থেকেও ধারণ করেছেন দেশকে ভিন্ন মাটিতে। আসলেই কি আমরা দেশ থেকে দূরে আছি? মনে হয় না! প্রবাসের কাংখিত জীবন যাপনের সাথে এক টুকরা মিষ্টি বাংলার স্বাদ আমাদের প্রতিনিয়ত দিয়ে যাচ্ছেন বিশ্বজিত দা। তাঁর সাধনার ফসল এই বইমেলাকে তিনি রুপ দিয়েছেন বাঙ্গালীর প্রাণের আলোর মেলাতে।
২৮ শে অক্টোবর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় লাগের্ডিয়া ম্যারিয়েট হোটেলের বলরুমে পাঁচদিন ব্যাপী এ বই মেলার ভার্চুয়াল উদ্বোধন করেন কবি আসাদ চৌধুরী। কানাডা থেকে তিনি তাঁর ভিডিও বার্তার বলেন যে, ‘বই আমাদের শক্তি। মানুষের কল্পনা শক্তিকে বাড়ানোর জন্য বইয়ের প্রয়োজন আছে। বই মানুষের জ্ঞানকে প্রজ্জ্বলিত করেছে । বই আমাদের নতুন পথ দেখাবে’। ৩০তম বাংলা বইমেলার আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখক ড. নুরুন নবী।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নিউইয়র্কের বিশিষ্টজনেরা। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবক, কলাকুশলী, লেখক -প্রকাশকদের আন্তরিক প্রচেষ্টায় বেশ সুপরিকল্পিত ভাবে সম্পন্ন হয়েছে পাঁচদিন ব্যাপী এই জমজমাট বইমেলা।
দেশ থেকে মেলায় অংশ নিয়েছেন এগারজন স্বনামধন্য পুস্তক প্রকাশনীর কর্ণধাররা! যথাক্রমে অনন্যা, আহমদ পাবলিশিং হাউস, কাকলী প্রকাশনী, কথাপ্রকাশ, ইত্যাদি, নালন্দা, বাতিঘর, অঙ্কুর ও অন্বয় প্রকাশনী। বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের নানা ধরনের বই পাওয়া যাচ্ছে তাঁদের স্টলগুলোতে। পাঠক – লেখকদের উপচে পরা ভীড়ের পাশাপাশি বই বিক্রিও ছিল বেশ আশাব্যঞ্জক। কেবল বাংলাদেশের প্রকাশকরা নন, নিজ নিজ স্টলে বই বিক্রিতে ব্যস্ত সময় পার করেছেন স্থানীয় লেখকরাও। তাঁদের কারো বই শেষ হয়ে গেছে মেলার তৃতীয় দিনেই। মেলার শেষদিন অনেক স্টলই ছিল প্রায় বই শুন্য।
বই মেলা উপলক্ষ্যে আগত লেখক-পাঠক- প্রকাশক এবং শিল্পীদের সম্বনয়ে আয়োজিত হয়েছিল নানারকম সাংস্কৃতিক এবং আলোচনা অনুষ্ঠান। অনুষ্ঠানমালার মধ্যে ছিল স্বাধীনতার ৫০ বছরের মূল্যায়ন, বহির্বিশ্বে অবস্থানরত বাংলাদেশিদের অবদান ও অভিবাসী লেখকদের বইয়ের পর্যালোচনা, কবিতা, একক নাট্যভিনয়। আগত প্রকাশক এবং লেখকদের আলোচনা অনুষ্ঠানে প্রকাশকরা বই প্রকাশের আগে নতুন লেখকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন বেশ গুরুত্বপূর্ণ কথা। তাঁদের মতে, যেনতেন একটা বই প্রকাশই মুখ্য কথা নয়! একটি মানসম্মত বই প্রকাশের আগে লেখককে অবশ্যই বেশ দীর্ঘ একটা সময় নিয়ে পান্ডুলিপি প্রস্তুত করা উচিত, এবং বইয়ের প্রথম সম্পাদনাটা লেখকের নিজেরই করা উচিত। এছাড়াও তাঁরা অভিবাসী লেখকদের সাহায্যর জন্য সব রকম প্রতিশ্রুতির ও আশ্বাস দেন। বিগত বছরগুলোর মতো এবারও বাংলা ভাষার একজন শ্রেষ্ঠ লেখককে তাঁর সার্বিক অবদানের স্বীকৃতি হিসাবে মুক্তধারা জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়। এবারের সন্মানিত লেখক ছিলেন বাংলা সাহিত্যর উজ্বল নক্ষত্র সমরেশ মজুমদার।
দেশ এবং প্রবাসের সেতুবন্ধন এই মেলা যেন কেবল আমাদের প্রথম প্রজন্মের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে। বাংলা বইয়ের পাশাপাশি এ দেশে বড় হওয়া নতুন প্রজন্মের জন্য ইংরেজীর অনুবাদ সংকলিত সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং ইতিহাস সংক্রান্ত বই রাখা খুব জরুরী। এর মাধ্যমে আমাদের সাহিত্য সম্ভার বেঁচে থাকবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, এবং নতুন প্রজন্মও আর্কষিত হবে আমাদের সাথে একই সাথে বইমেলার বন্ধনে! তাই আসুন, বই কিনি এবং পড়ি; বাঁচিয়ে রাখি আমাদের সাহিত্য – কৃষ্টি এবং সংস্কৃতি।

লেখক; কবি ও গল্পকার।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর