• E-paper
  • English Version
  • রবিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২১, ১২:১৮ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক আলহাজ্ব দিদার হোসনের না বলা কথা || আখতারুজ্জামান তরপদার

বার্তা সম্পাদক, শব্দকথা টোয়েন্টিফোর ডট কম
  • আপডেটের সময় বৃহস্পতিবার ১৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২১

প্রবীণ এক বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিকের স্মৃতিচারণ। তিনি কোন সময়ে পদ-পদবীর কাঙ্গাল ছিলেন না। নেতা হওয়ার বাসনাও তাকে কোন সময় স্পর্শ করেনি। ষাটের দশকের শুরুতে হবিগঞ্জে আওয়ামীলীগের কোনো কার্যালয় ছিল না। ছিল না অনেকেরই ল্যান্ড ফোন। তখনকার সময়ে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানই ছিল আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীর ঠিকানা। হবিগঞ্জ শহরের টাউন হল রোড এর স্ট্যান্ডার্ড টি হাউজ। এই হাউজে ছিল ল্যান্ড ফোন। মরহুম এডভোকেট মোস্তফা আলী সহ তখনকার আওয়ামীলীগ নেতাকর্মীর যোগাযোগ স্থান ছিল সেই স্ট্যান্ডার্ড টি হাউজ। আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভাল ছিল না। নেতৃত্বস্থানীয় দুই একজনের অর্থেই দলীয় কর্মসূচি হত। মাইকিং করার মতো অর্থও যোগান দিতে হতো। হবিগঞ্জে আওয়ামীলীগের একমাত্র যোগাযোগ স্থল ছিল স্ট্যান্ডার্ড টি হাউজের স্বত্বাধিকারী আলহাজ দিদার হোসেনের সেই ব্যবসা প্রতিষ্টান।

বহুলা গ্রামের বাসিন্দা ৮৫ বছর বয়স্ক আলহাজ্ব দিদার হোসেন স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে বলেন, কোন পদ পদবী আগেও চাইনি, এখনো না। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হয়ে তার আদর্শ বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারলে, পরপারে গিয়েও শান্তি পাবো। বিপত্নীক দিদার হোসেন এখন বাড়িতে বসে নাতি নাতনির সাথে গল্প গুজব আর মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করেই সময় কাটান। তবে, আওয়ামীলীগের বিশেষ কোনো মুহূর্তে জেলা পর্যায়ের কোনো কোনো নেতার পদধুলি তার বাড়িতে পরে। জীবনের ক্রান্তিলগ্নে এসে আলহাজ্ব দিদার হোসেন মনে প্রশান্তি পান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা “তাকে হবিগঞ্জের দিদার চাচা বলে সম্মোধন করে বুকে জড়িয়ে ধরেন।” সে প্রশান্তি নিয়েই যেন বেঁচে আছেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দু/একবার দেখা হয়েছে। এখন স্বাস্থ্যগত কারণে ঢাকা যাওয়া সম্ভব হয়নি। তাই দেখা হয়না।

সেই সময় শেখ মুজিবুর রহমান নামেই বাংলার মানুষ তা কে জানত। অনেকেই মুজিব ভাই বলে সম্বোধন করতেন। বিশাল হৃদয়ের মুজিব ভাই খুব সহজে মানুষকে আপন করে নিতে অসাধারণ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। হবিগঞ্জের কৃতিসন্তান এড.মোস্তফা আলী কলকাতা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। বঙ্গবন্ধুও একই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ছিলেন। যে কারণে হবিগঞ্জের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে মোস্তফা আলী সাহেবের সাথে ছিল গভীর সম্পর্ক। কিন্তু এই শহরে তৎকালীন মুসলিম লীগ ছিল প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর। এখানে আওয়ামীলীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড করা ছিল দুঃসাহসী কাজ। এ সময়ে বঙ্গবন্ধুর সাথে পরিচয় হয় আমার বড় ভাই বহুলা গ্রামেরই বাসিন্দা জবান ভাইয়ের সাথে। মোস্তফা আলী সাহেব ও জবান ভাই দুজনেই একে অপরের পরিপূরক ছিলেন। বঙ্গবন্ধু জবান উল্লাহ সাহেব কে জবান ভাই নামে সম্বোধন করতেন।

১৯৬৬ সালে বাঙালীর মুক্তি সনদ ৬৬ দফা ঘোষণার আগে থেকেই বঙ্গবন্ধু সিলেটে সাংগঠনিক যাতায়াত ছিল। প্রকাশ্যে কোনো কিছু করা ছিল বিপদসংকুল। বর্তমানে সড়ক পথে যাতায়াত যত সহজ তখন ছিল না । একমাত্র রেল ট্রেন ও জলপথই ছিল ভরসা। বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক কাজে দেশের প্রতিটি দুর্গম অঞ্চলে সাহসিকতার সাথে যাতায়াত করেছেন। সিলেটে আসার পর হবিগঞ্জে আসার জন্য নেতৃবৃন্দ ছুটে গেলে বঙ্গবন্ধু বলতেন, “জবাই কোথায়, জবান ভাই বললেই আমি হবিগঞ্জে যাব। নয়তো নয়।“ হবিগঞ্জে আসার আগেই প্রিয় জবান ভাইয়ের শরণাপন্ন হতেন তিনি।

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বঙ্গবন্ধুকে আন্দোলনের মাধ্যমে জেল থেকে মুক্তি দিতে পাকিস্তানি সরকার বাধ্য হয়। তখনই ছাত্র-জনতার বিশাল সভায় শেখ মুজিবুর রহমানকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তৎকালীন হবিগঞ্জ মহাকুমায় আওয়ামী লীগের গোড়াপত্তন মজবুত হয়ে ওঠে। যারা এই দুঃসাহসিক কর্ম সাধিত করেছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ বেঁচে নেই। গভীর শ্রদ্ধা ও সম্মানের সাথে তাদের পরিচয় তুলে ধরা নৈতিক দায়িত্ব বলে বোধ করি। গভর্নর এডভোকেট মোস্তফা আলী তার অন্যতম সহযোগী জবান উল্লাহ, তেগরিয়া গ্রামের মরহুম হাজী মশ্বব আলি, ভাদৈ গ্রামের চেয়ারম্যান মরহুম আব্দুল মান্নান, বাহুবল খাগাউড়া গ্রামের মানিক চৌধুরী পরে কমন্ড্যান্ট মানিক চৌধুরী নামে সমধিক পরিচিত। বেবীস্ট্যান্ড এলাকার এডভোকেট আশরাফ আলী, মানিক জজের ভাই ডিড রাইটার দরছ মিয়া, হুর গাও গ্রামের মরহুম তোতা মিয়া, বহুলা গ্রামের সুন্দর আলী, চুনারুঘাটের অ্যাডভোকেট তালিব হোসেন, বেবীস্ট্যান্ড এলাকার এডভোকেট রজব আলী, বহুলা গ্রামের ইউনুছ চৌধুরী, জেকে এন্ড এইচ হাইস্কুলের তৎকালীন শিক্ষক এনামুল হক মোস্তফা শহীদ, শায়েস্তানগর এলাকার এডভোকেট আকদ্দছ আলী, শায়েস্তাগঞ্জের নিব্বর আলী তালুকদার। হবিগঞ্জ মহকুমা শহরসহ অন্যান্য থানা এলাকায় অনেকেই দলীয় কাজে অংশ নিয়েছেন। সকলের নাম পরিচয় এই মুহূর্তে স্মৃতিতে আসেনি। মৃত অথবা জীবিত যারা আছেন সকলের প্রতি আমার বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ।

আলহাজ দিদার হোসেন তখঙ্কার সময়ে গোড়া সমর্থকই ছিলেন না, অনেক নেতাকর্মীকেই আর্থিকভাবে সহায়তা করেছেন। যাদের সহায়তা করেছেন তাদের পরিচয় দেয়া উচিত নয় । কারণ তারা এখন কেউই বেঁচে নেই।

দীর্ঘ আন্দোলন জেল-জুলুম দুর্যোগের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। কিন্তু পাকিস্থানি শাসকগোষ্ঠী তা মেনে নেয়নি। তখনই, হাজার বছরের শ্রেষ্ট বাঙ্গালী, জন মানুষের অধিকার আদায়ের প্রতীক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সারাদেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠে।

১৯৭১ সালে ৭ই মার্চ রেসকোর্স ময়দানে স্বাধীনতার অঙ্গীকার দৃঢ়তার সাথে ঘোষাণা করেন। তখনই স্বাধীনতা যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে।

দেশে পাকিস্তানীরা রক্তের হোলিখেলা, অগ্নিসংযোগ, ধর্ষণ লুটপাটের ঘটনা শুরু করে। ঢাকাসহ সারাদেশের মতো হবিগঞ্জও উত্তাল হয়ে ওঠে। নেতৃবৃন্দ যখন মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের কাজে ব্যস্ত, সেই সময় হবিগঞ্জের টেলিফোন-টেলিগ্রাফ অফিস এর দায়িত্ব পরে দিদার হোসেন ও মানিক চৌধুরী চৌধুরীর ছোট ভাই মরহুম ইয়াকুত চৌধুরীর উপর। দিনরাত টেলিগ্রাফ অফিসেই কাটাতে হত তাদের। আওয়ামী লীগের এমন একসময় গেছে, মাইক নিয়ে প্রচার করা ছিল এক দুঃসহ ব্যাপার। দিদার হোসেন তার প্রাণ প্রিয় পুত্র তাজুল ইসলাম কে মাইক নিয়ে রাজপথে মাইকিং করতে পাঠিয়ে দিতেন।

দেশ স্বাধীন হলো । ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী পাকিস্তানি কারাগার থেকে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। একটি ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দেশ গড়তে বঙ্গবন্ধু নেমে পড়লেন। স্বাধীনতা বিরোধী চক্র ও আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়া স্বার্থান্বেশী একটি অংশ অস্থির করে তুলল। শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে কৃষক শ্রমিক আওয়ামীলীগ (বাকশাল) গঠন করলেন। আবারো মাঠ পর্যায়ের ছুটে এলেন।

গভর্নর এডভোকেট মোস্তফা আলী সাহেবের বাসায় কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) এর অফিস উদ্বোধন করলেন। আমরা সবাই সমবেত হলাম এই হল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে শেষ দেখা।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর