• E-paper
  • English Version
  • শনিবার, ১৬ অক্টোবর ২০২১, ০৫:০৭ অপরাহ্ন

শিক্ষা ক্ষেত্রে করোনার প্রভাব ও আমাদের করণীয় || ড. সুভাষ চন্দ্র দেব

লেখক; সহকারী অধ্যাপক, বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ।
  • আপডেটের সময় সোমবার ২১ জুন, ২০২১

গত পনের মাস ধরে ক্লাস হচ্ছে গ্লাসে! রুম চলে গেছে জুমে! মানে ক্লাসরুমের পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের চোখ বসাতে হচ্ছে মোবাইল, ট্যাব, ল্যাপটপ কিংবা পিসি’র গ্লাস মনিটরে। যে শিশুটি কখনো স্মার্টফোন চায়নি বা চেয়েও পায়নি, তাকেও অভিভাবকরা অনলাইন ক্লাসের জন্য তাদের গেজেটটি তুলে দিচ্ছেন। ফলাফল হাতেনাতে পাওয়া যাচ্ছে! ইতোমধ্যেই অকালে বাচ্চাদের চোখে উড়ে এসে জুড়ে বসছে বড়ো বড় চশমা। সুন্দর মায়াবী চোখগুলো কাঁচের আড়ালে ঢাকা পড়ছে। বড়দের চোখেও চশমা লাগানোর হার গত কয়েকমাসে বেড়েছে। আমি দু’মাস আগে চশমা নিতে বাধ্য হয়েছি। স্ত্রীর আগেই ছিলো, আর বাচ্চাটির চশমা লাগা হয়তো ঠেকানো যাবেনা! অনলাইন ক্লাসের সাথে বোনাস হিসাবে স্মার্টফোনের যে আসক্তি ইতোমধ্যেই হয়েছে তাতে তিনজনের চোখের সংখ্যা বারোটা হতে বেশি দেরি নেই! বাচ্চার ক্লাসের অন্যদের কারো কারো চোখেও এরইমধ্যে নানা সাইজের চশমা বসেছে। ক্লাসের ফাঁকে অনলাইন গেইমেও অভ্যস্ত হচ্ছে। বাচ্চাদের এই নেট আসক্তি কিংবা গেজেট আসক্তির ফলে শেষমেশ একটা প্রজন্মকে হয়তো দূর্বল স্বাস্থ্য, চিন্তা ও মননে বড় হতে হবে।

বিজ্ঞাপন


বিশ্বব্যাপী কোভিড-১৯ শিক্ষা সেক্টরকে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড় করেছে। উন্নত বিশ্বের দেশগুলোতে আগে থেকেই ভার্চুয়াল এডুকেশনের নূন্যতম একটা কাঠামো ছিলো ফলে অনলাইন সিস্টেমে যাওয়া বা অনলাইন-অফলাইন সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্লেন্ডেড টিচিং-লার্ণিংয়ে অভ্যস্ত হতে তাদের বেশি বেগ পেতে হয়নি। আমাদের মতো কনভেনশনাল লার্ণিং সিস্টেমে অনেকটা জিরো থেকেই অনলাইন শিক্ষা শুরু করতে হয়েছে। এরজন্য আমাদের বড় কোনো কাঠামো কিংবা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ছিলোনা, এমনকি এই ক্ষেত্রে কোনো প্রণোদনাও ছিলোনা, কিন্তু অনেকটা স্বশিক্ষিতের মতো শিক্ষকগণ অনলাইন টিচিংটা চালিয়ে যাচ্ছেন। বাস্তবে এতে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ যে কাজটি হচ্ছে সেটা হলো স্টুডেন্ট এনগেজমেন্ট, অর্থাৎ শিক্ষার্থীরা অন্তত জানতে পারছে তাদের প্রতিষ্ঠানটি তাদের জন্য আছে, তাদের শিক্ষকগণ তাদের জন্য ভাবছেন এবং তাদের পাঠের বিষয়বস্তুটি তাদের সামনে তুলে ধরছেন । অবশ্য প্রশ্ন উঠেছে অনলাইন এডুকেশন সকল শিক্ষার্থীর কাছে পৌঁছাতে পারছে কিনা কিংবা কতোটা সফল হচ্ছে? সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো ও কারিকুলাম উন্নয়নের মাধ্যমে এসব প্রশ্ন মিটিয়ে ফেলা যায় সহজেই। সমস্যাকে সম্ভাবনায় রূপান্তরের সুযোগ এসেছে আমাদের। প্রত্যেকটি প্রতিষ্টানে আমরা অনলাইন ক্লাসের জন্য স্টুডিও, স্মার্ট বোর্ড, ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ এবং অনলাইন এনগেজমেন্ট সফটওয়্যার তৈরি করতে পারি। এভাবে কোভিড পরবর্তী আগামীদিনের পরিকল্পনায় অফলাইনের সাথে অনলাইন এডুকেশনকেও জায়গা করে দিয়ে ব্লেন্ডেড টিচিংকে গ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

দীর্ঘদিন সরাসরি পাঠদান বন্ধ থাকায় ইতোমধ্যেই শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি শুরু হয়েছে। শিক্ষার্থীরা ক্লাসরুমে ফিরতে উন্মুখ। অভিভাবকরা বিভিন্ন প্লাটফর্মে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য আলটিমেটাম দিয়েছেন বলেও জানা যায়। তবে তারা কেউই কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কিংবা সংক্রমন রোধে বিকল্প ব্যবস্থার কথা উপস্থাপন করেননি। সরকার এ ব্যাপারে বরাবরই সতর্ক এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণ করছেন। বস্তুতঃ সঠিক পদক্ষেপ গ্রহণের কারণেই সকল পূর্বানুমান ব্যর্থ করে এখনো কোভিড পরিস্থিতি আমাদের দেশে নিয়ন্ত্রণহীন হয়নি। মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবেই বলেছেন, আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের ঝুঁকিতে ফেলতে চাইনা। তিনি বলেছেন সংক্রমণের হার কমলে এবং নিরাপদ মনে করলেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলবে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত দেশে তিন কোটির উপরে শিক্ষার্থী রয়েছেন। রয়েছেন এদের পরিবারও। বিশ্বের অধিকংশ দেশের জনসংখ্যাও এরচেয়ে কম! এই বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী তাদের প্রতিষ্ঠানে শারীরিক দূরত্বসহ কোভিড-১৯ এর স্বাস্থ্য নির্দেশনা মেনে চলা কতোটা সম্ভব সেটা আসলেই প্রশ্ন সাপেক্ষ। অন্যান্য বিভিন্ন ব্যবস্থাপনার সাথে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মাধ্যমেই সামাজিক সংক্রমণের সবচেয়ে বড় আশংকাটিকে আটকানো গেছে বলে বিশেষজ্ঞগণ মনে করেন। আজ যারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধে দোষারোপ করছেন, কোভিড নিয়ন্ত্রণে সামান্য ব্যার্থতায় কাল তারাই সরকারের উপর খড়গহস্ত হবেন। সুতরাং, মহামারীর বিস্তার রোধে সরকার যথার্থ পদক্ষেপই নিয়েছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে জনগোষ্ঠীর ৮০ ভাগের টিকাদান সম্পন্ন হলে মহামারী নিয়ন্ত্রণে আসবে। সরকার সে চেষ্টাও করছেন। তবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার জন্য উপায় খুঁজতে হবে, শিক্ষা সেক্টরের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে দীর্ঘমেয়াদী কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এক্ষেত্রে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহের অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে লাগতে পারে। সম্প্রতি ভারত সরকারের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা প্রোগ্রামের (আইটেক) আওতায় পাঞ্জাবের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনলাইন কোর্সে অংশ নিয়েছিলাম। এই কোর্সে তাদের শিক্ষকদের অনলাইন এবং অফলাইনে পাঠদান সমন্বয়ের উপর চমৎকার সব কার্যক্রম এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। এই সময়ে শিক্ষা ব্যবস্থা চালিয়ে নেয়ার জন্য একদিকে তারা তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক ক্লাস নেয়া, পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও অনুশীলনের জন্য নতুন নতুন ইনোভেটিভ টুলস উদ্ভাবন করেছেন, অন্যদিকে কোভিড পরবর্তী সময়ে কিভাবে অনলাইন থেকে অফলাইনে যাবে এবং সমন্বয় করবে তারও রূপরেখা তৈরি করে রেখেছেন। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো অফলাইন এডুকেশনে যোগদানের পূর্বেই শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য তথ্য এবং অঙ্গীকারনামা বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদেরও যখনই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার সুযোগ হবে সরকারের পক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান অভিভাবকদের অঙ্গীকারনামা নিতে পারে কিনা ভেবে দেখতে হবে। একই সাথে সরকার নির্দেশিত কাউন্সিলিং কার্যক্রমটি চালাতে হবে।

আরেকটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। সম্প্রতি বিভিন্ন পত্রিকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ, শিক্ষকরা বসে বসে বেতন নিচ্ছেন ইত্যাদি বক্তব্য আসছে। এমনকি এই সময়ে শিক্ষকদের কেনো প্রমোশন হবে এমন প্রশ্নও দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা গেছে। মূলত সরকারি নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের শারীরিক উপস্থিতিতে পাঠদান ছাড়া প্রতিষ্ঠান ভেদে নিয়মিত অন্যান্য কার্যক্রম ঠিকই চলছে। একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান শুধুমাত্র পাঠদান দিয়েই চলেনা এর বাইরে শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ও প্রশাসনিক নানাবিধ কাজ থাকে, সেগুলো বন্ধ হয়নি কিংবা সেগুলো বন্ধ করে দিয়ে সরকার সবাইকে ছুটি দিয়ে দেননি। বাহ্যিকভাবে আমরা যেটুকু দেখি সেটুকু দিয়ে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ কর্মপরিধি বা অন্য প্রতিষ্ঠানের সাথে আন্তসম্পর্ক সম্পর্কে চুড়ান্ত মতামত দেয়া বা নেগেটিভ বক্তব্য দেয়া যথার্থ নয় বরং এটি সংশ্লিষ্টদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে। সবগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একই পর্যায়ের নয় বা একই বয়স গ্রুপের শিক্ষার্থী নিয়ে কাজ করেনা। সেজন্য প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান তার নিজস্ব অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী কাজ করে চলছে এমনকি কোভিড পরবর্তী সময়ে কিভাবে নতুন করে পাঠদান শুরু করবে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করে যাচ্ছে।
করোনা মহামারী বিশ্ব ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দিচ্ছে। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রেও অসাম্য এবং লক্ষ্যচ্যুত হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সেভ দ্যা চিলড্রেন এর তথ্য মতে পৃথিবী জুড়ে প্রায় ৭৭ কোটি শিক্ষার্থীর জীবন মহামারীতে ঝুঁকিগ্রস্ত। দীর্ঘদিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে মনো-সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। গৃহবন্দি শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ করা সামনের দিনে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে। প্রায় এক কোটি শিশু শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ঝরে পড়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। অন্যদিকে ইউনিসেফ বলছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৩৮ শতাংশ শিক্ষার্থী মারাত্মকভাবে মানসিক ও শারীরিকভাবে প্রভাবিত হয়েছে। আর বিশ্বে আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া দেশগুলি ২০২১ সাল থেকেই শিক্ষার বাজেটে কাটছাঁট শুরু করবে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের সঠিক পরিকল্পনার বিকল্প নেই। একইসাথে সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবকসহ সমাজের সকল শ্রেণির নাগরিকদের সহনশীল হতে হবে, আবেগ তাড়িত না হয়ে বিবেককে কাজে লাগাতে হবে। কারো মনোবল ভেঙে দেয়ার মতো অন্যায্য আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে। সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় মহামারী মোকাবিলা করে শিক্ষার লক্ষ্য অর্জনে সচেষ্ট হতে হবে।

লেখক; সহকারী অধ্যাপক, বৃন্দাবন সরকারি কলেজ, হবিগঞ্জ।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর