• E-paper
  • English Version
  • বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:০২ পূর্বাহ্ন

শেরপুরে মিশ্র ফল চাষে সফল হযরত আলী !

মইনুল হোসেন প্লাবন, শেরপুর
  • আপডেটের সময় বুধবার ১০ নভেম্বর, ২০২১

শেরপুরে প্রায় ৮০০ একর জমিতে মিশ্র ফল চাষ করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন হযরত আলী (৩৭) নামে এক উদ্যমী যুবক। সফল ফলচাষী হযরত আলী এখন তার বাগানে ফল চাষের পাশাপাশি শুরু করেছেন পরীক্ষামূলক মাছ চাষ, কবুতর, মুরগী ও গরু পালন। তার ওইসব বাগান ও প্রকল্পের সফলতা দেখে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন এলাকার আরও অনেকেই।

জানা যায়, একসময় অর্থাভাবে খুব কষ্টে জীবনযাপন করতেন শেরপুর সদর উপজেলার হাজী মো. ইব্রাহিম খলিল উল্লাহর ৩ ছেলের মধ্যে সবার বড় হযরত আলী। তাই তিনি রাজধানী ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে মনোহারী ব্যবসা শুরু করেন। ব্যবসার ফাঁকে তিনি চিন্তা করেন নিজ এলাকায় একটি ফলের বাগান করার। এ ভাবনা থেকেই কৃষি বিশেষজ্ঞদের কাছে পরামর্শ নিয়ে সদর উপজেলার রৌহা ইউনিয়নের নিজ গ্রামে ২০১৯ সালে ১শ বিঘা জমিতে বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করেন মাল্টা, কমলা, আঙুর, ড্রাগন, লটকন, পেপে, পেয়ারা, লেবু, কুল বড়ই, সৌদি খেজুরসহ ১২টি প্রজাতির ফলের। বাণিজ্যিক চাষে সফল হওয়ার পর এখন তিনি বিদেশী উন্নত জাতের এভোকাডো, ফ্রাই ছবেদা, মালবেরি, ত্বীন ফল, আলুবোখারা, ভিয়েতনামী নারিকেল, কিউই, আনার, থাই সরিষাসহ আরও ২৭১টি জাতের ফলের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু করেছেন। ইতোমধ্যে তিনি শেরপুর সদর উপজেলার রৌহা, ভাতশালা, কামারিয়া ও বলাইয়েরচর ইউনিয়নে প্রায় ৮শ বিঘা জমিতে ১২টি ফল ও চারা উৎপাদন বাগান করেছেন। ১শ বিঘা জমি নিজের থাকলেও বাকী জমি তিনি ২০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছেন। তার বাগানের মাল্টাসহ অন্যান্য ফল ফরমালিন মুক্ত থাকায় এবং ক্ষতিকর কীটনাশক ব্যবহার না করায় এখানে উৎপাদিত ফলের চাহিদা বেশী।

সরেজমিনে গেলে কথা হয় সফল ফলচাষী হযরত আলীর সাথে। তিনি জানান, দেশের মানুষকে বিষমুক্ত তাজা ফল উৎপাদনের চিন্তা থেকেই আমি মা-বাবার দোয়া ফ্রুড গার্ডেন এন্ড এ্যাগ্রো ফার্ম নামে ফলের বাগান শুরু করি। প্রথমে ফল চাষ আশানুরূপ হওয়ায় পরবর্তীতে একটি নার্সারী ও আরও ১১টি ফলের বাগান তৈরি করেছি। আমার যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, তার চেয়ে বেশী ফল উৎপাদন ও বিক্রি হচ্ছে। আমার বাগানে বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৫২ হাজার ফলের গাছ রয়েছে। এর মধ্যে ১৯ হাজার মাল্টা গাছ রয়েছে। তিনি বলেন, প্রতিদিনই অনেকেই এ ফল বাগান দেখার জন্য আসেন দেখেন। তারা বাগান ঘুরে দেখেন, ফল কিনেন, আবার কেউ কেউ ফল বাগান করার সহায়তা চান। আমরা মানুষের বাসায় ছাদ বাগান করে দিয়ে থাকি। ইতোমধ্যে একশরও বেশি ছাদবাগান আমরা করে দিয়েছি।

বাগানের ম্যানেজার আবু সাঈদ জানান, আমাদের বাগানে ক্রেতারা প্রতিনিয়তই আসতে থাকায় ফল বিক্রি অব্যাহত রয়েছে। এ বছর ১৪ কোটি টাকার ফল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ছিল। ইতোমধ্যে বাগান থেকে ১০ কোটি টাকার ফল বিক্রি করা হয়েছে। এতে আশা করা হচ্ছে ১৪ কোটি টাকার বেশী টাকার ফল বিক্রি করা সম্ভব হবে।
হযরত আলীর নার্সারি ও বাগানে এখন দুইশর বেশী শ্রমিক কাজ করছেন। ফল বাগানের শ্রমিকরা মজুরিও পান ভালো। সামনে আরও অন্তত অর্ধসহস্রাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান হবে বলে আশা হযরত আলীর।

বাগানের শ্রমিক মো. শাহিন মিয়া জানান, একেবারে গ্রামের ভেতরে এ বাগানটি গড়ে তোলায় আমাদের কর্মসংস্থান হয়েছে। এখন আমাদের ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়া করানোসহ সংসার চালাতে কোন চিন্তা করতে হয় না।

আরেক শ্রমিক মো. আব্দুল জলিল জানান, এই বাগানের শুরু থেকেই আমি কাজ করছি। ভালো টাকাও পাই। আমার কাজ করতে অন্য জায়গায় যেতে হয় না। বাড়িতে থেকেই কাজ করতে পারছি।

এদিকে, হযরত আলীর সফলতা দেখে এলাকার আশেপাশের অনেকেই উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন মাল্টাসহ অন্য ফল চাষ করতে। অনেকেই শুরুও করেছেন। স্থানীয় কৃষক মো. হাবিবুর রহমান জানান, হযরতের ফলচাষে সফলতা দেখে আমার ১০ কাঠা জমিতে এবার মাল্টার চাষ করেছি। বাগানের গাছগুলো বেশ সুন্দর হয়েছে। সামনে আরো বাগান করার পরিকল্পনা রয়েছে। হযরত আলীর ফলবাগানগুলো দেখার জন্য প্রতিদিনই জেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে মানুষজন আসেন। বাগান দেখে মুগ্ধ হন তারা। বাগানে ঘুরতে আসা শহরের নবীনগর এলাকার কামাল হোসেন বলেন, বাগানটি অনেক সুন্দর। এখানে ঘুরতে এসে সবুজ পরিবেশে বেশ ভালো লাগছে। একই কথা জানান ওয়াহিদ, সাঈদ আহমেদসহ কয়েকজন।

এ ব্যাপারে শেরপুর সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুবাইয়া ইয়াসমিন জানান, আমাদের ধারণাই ছিলো না শেরপুরের সমতল ভূমিতে মাল্টা চাষ সম্ভব হবে। কৃষক হযরত আলী মাল্টা চাষে সফল হওয়ায় উজ্জল সম্ভাবনা দেখছি আমরা। তার বাগানে মাল্টাসহ অন্যান্য ফল চাষে বিদেশি ফল আমদানী অনেকাংশেই হ্রাস পাবে বলে আশা করছি। তিনি আরও বলেন, আমরা হযরত আলীসহ স্থানীয় কৃষকদের নানাভাবে পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করে আসছি। তার মতে, হযরত আলীর বাগানটি অন্যদেরও সফলতায় অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর