• E-paper
  • English Version
  • শনিবার, ২৩ অক্টোবর ২০২১, ১০:৪৯ অপরাহ্ন

সিনেমা বা নাটক নয়, নেত্রকোনা থেকে জোনাকির লাশ নিয়ে আসে অনিক পান্ডে; রাতভর জিজ্ঞাসাবাদ

আকিকুর রহমান রুমন (বানিয়াচং) হবিগঞ্জ
  • আপডেটের সময় রবিবার ২৫ অক্টোবর, ২০২০
হবিগঞ্জ বানিয়াচং সড়কে জোনাকির লাশ রাস্তায় ফেলে পালিয়ে যায় খুনী অনিক পান্ডে। অবুঝ শিশুটি মায়ের লাশের পাশে দাঁড়িয়ে কি যেন বলতে চাচ্ছে অপলক দৃষ্টিতে থাকিয়ে।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং সড়কে রাস্তার পাশে এক গৃহবধূ মহিলার লাশ রেখে পালিয়ে যাওয়ার এলাকাবাসী ও জনতার হাতে আটক হয় এক ঘাতক খুনী।
এলাকাবাসী ও বিভিন্ন সূত্রে এবং থানা পুলিশের কাছ থেকে জানাযায়, (২৪ অক্টোবর) শনিবার বিকাল ৩টার হবিগঞ্জ-বানিয়াচং আঞ্চলিক সড়কের পাশ থেকে লাশ পড়ে থাকার খবর ও একজনকে আটক করে রাখার সংবাদ পেয়ে ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করে থানা পুলিশ এবং জনতার হাতে আটক হওয়া যুবককে বানিয়াচং থানায় নিয়ে আসেন তারা।

বিজ্ঞাপন

নিহত মহিলার লাশের পরিচয় হলো বানিয়াচং উপজেলা সদরের চতুরঙ্গ রায়েরপাড়া মহল্লার বাসিন্দা রাইছ মেইল চালক মোঃআবু মিয়ার কন্যা জোনাকি (২২) এবং বানিয়াচং উপজেলা সদরের কুতুবখানী মহল্লার অপু মিয়ার স্ত্রী। অপু জোনাকির সংসারে ১টি ছেলেও ১টি মেয়ে রয়েছে।

এদিকে আটক খুনীর পরিচয় হলো, বানিয়াচং উপজেলা সদরের কাষ্টগড় গ্রামের মৃত মৃনাল পান্ডের পুত্র অনিক পান্ডে(৩০)।
এদিকে নিহত জোনাকীর মা হেনা বেগম সাংবাদিকদের জানান, প্রায় মাস খানেক পূর্বে এক সন্তান ও স্বামীকে রেখে নিহত জোনাকী তার ছোট বাচ্ছাকে নিয়ে পালিয়ে যায় অনিক পান্ডের হাত ধরে। কিন্তু পালিয়ে যাবার পর অনিকের ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বার(০১৭০৪-৮৯৬১৫১)থেকে ফোন দিত তার ব্যবহৃত মোবাইল নাম্বারে(০১৭৭৩-৯৯৯৯৬২)ফোনে।
তিনি তার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বহু আকুতি মিনতি করেন এমনকি তাদের অবস্থান জানতে চাইলে থাকে, বিভিন্ন সময় বিভন্ন স্থানের কথা বলতো অনিক পান্ডে।
ঢাকা, চট্রগ্রাম, কুমিল্লাসহ আরও বেশ কয়েক জায়গার ঠিকানা বলতো।

ঘাতক অনিক পান্ডে পালানোর সময় জনতা দৌড়িয়ে একটি হাওরের ডোবা থেকে আটক করে। পরে পুলিশ গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে এবং আটক অনিক পান্ডেকে থানায় নিয়ে আসে।

এমনকি তার পূর্বের স্বামীকে ডিভোর্স করিয়ে তার মেয়ে জোনাকিকে নাকি বিয়ে করেছে বলেও জানায় থাকে। গতকাল শনিবার হঠাৎ করে দুপুর ২টার দিকে হেনা বেগমকে তার নাম্বারে ফোন করে অনিক পান্ডের মোবাইল ফোন দিয়ে জানায়, তার মেয়ে জোনাকী সিলিং ফ্যানের আঘাতে মারা গেছে জোনাকির লাশ নাকি এ্যাম্বুলেন্সে করে পাঠাচ্ছে।
এই আলাপ চারিতার কিছুক্ষন পর পরই হবিগঞ্জ-বানিয়াচং রোডে চলাচলকারী যাত্রী সাধারন একটি লাশ ও লাশের পাশে একটি ছোট বাচ্ছা কান্না করার দৃশ্যটি দৃষ্টিগোচর হয়। এসময় লাশটি বহনকারী এ্যাম্বুলেন্স চালক লাশ ও অনিক পান্ডেকে নামিয়ে দিয়ে এম্বুলেন্স নিয়ে পালিয়ে যায়।
এসময় অভিযুক্ত অনিক পান্ডে পাশ্ববর্তী খাল পেরিয়ে চলে যাওয়ার সময় এলাকাবাসী ও জনতা মিলে তার পিছনে পিছনে দৌড়িয়ে গিয়ে আটক করে থানা পুলিশের হাতে সোপর্দ করেন।

এ ব্যাপারে নিহতের মা হেনা বেগম আরও জানান, সে আমার মেয়ে জোনাকি খুন করেছে আমি এই খুনের বিচার চাই।
শুধু আমার মেয়েকে খুন করে নাই এতিম করেছে জোনাকির শিশু সন্তানদের এবং দুটি পরিবারকেও খুন করেছে এই নষ্ট নেশাখোর দূর্দর্ষ খুনী অনিক পান্ডে।
তাই আমি সরকারের কাছে আমার মেয়ে হত্যার সঠিক বিচার চাই।
এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বানিয়াচং সার্কেল মোঃ সেলিম মিয়া জানান, এই হত্যার ঘটনা সম্পর্কে তদন্ত চলছে এবং অনিক পান্ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর তিনি এবিষয়ে জানাবেন।এম্বুলেন্স আটক হওয়া সম্পর্কে তিনি নিশ্চিত করে কোন কিছু বলতে পারেননি।
এব্যাপারে থানা ইনচার্জ মোঃ এমরান হোসেন বলেন, লাশ উদ্দার করা হয়েছে এবং লাশের ময়নাতদন্ত করার পর বলা যেতে পারে এটি হত্যা না আত্বহত্যা।
এছাড়া অভিযুক্ত অনিক পান্ডেকে গভীর রাত পর্যন্ত জিজ্জাসাবাদ করা হচ্ছে।এম্বুলেন্স আটক হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, অন্য উপজেলার ঘটনায় একটি এম্বুলেন্স আটক হয়েছে বলে তিনি জেনেছেন।
এটি এই ঘটনার এম্বুলেন্স নয় বলেও জানান।
এব্যাপারে কোন অভিযোগ মেয়ের পক্ষ থেকে হয়েছে কিনা জানতে চাইলে, তিনি বলেন এখনো হয়নি।
এদিকে এই ঘটনা বানিয়াচংসহ সর্বত্র মহলে জানাজানি হয়ে পরলে, এই বিষয়টি আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে চলে আসে।
এছাড়া লোকমুখে অনিক পান্ডে সম্পর্কে তার আপন এক বড় ভাই অভিজিত পান্ডে পুলিশ ও তার দাদা মুক্তিযোদ্ধা দুলন পান্ডের নাম ভাঙ্গিয়ে নানান অপকর্ম ও অপরাধ জগতে পা-রাখার বিষয়টিও আলোচনাতে চলে আসে। এমনকি নিজ বাড়িতে ঘরে তুলে সকল অপরাধীদের নিয়ে আস্তানা ও ইয়াবাসহ বিভিন্ন নেশা করার স্থান।

বিজ্ঞাপন

এলাকায় চুরি, ডাকাতিসহ চিহ্নিত সকলের সাথে থেকে বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়াতো অনিক পান্ডে। তার এমন কার্যকলাপে এলাকাবাসী অতিষ্ট হয়ে তার পিতা মানিক পান্ডের কাছে বিচার প্রার্থী হয় এলাকাবাসী।তিনি অনিক পান্ডেকে শাসানোর কারনে উল্টো তার পিতাকে খুন করার জন্য ‘দা’ নিয়ে তেড়ে আসে পিতার দিকে অনিক পান্ডে। তখন এলাকাবাসী অনিকের পিতা মানিক পান্ডকে বাচান।
ছেলের এমন কার্যকলাপে মানিক পান্ডে রাগে, ক্ষোভে যত্রনায় ঐদিন রাতে কিটনাশক পান করে মারা যান।
এতেও ক্লান্ত হয়নি বর্তমান খুনী হিসাবে পরিচিতি পাওয়া অনিক পান্ডের। পিতার মৃত্যুর পর আরও বেপরোয়া হয়ে উঠে, এমনকি সকল ইয়াবা ব্যাবসায়ী ও সেবনকারী, চুর, ডাকাতদের নিয়ে দিনে রাত তার রুমে মজমা জমিয়ে সকল অপরাধ পরিচালনা করে।
অনিকের বাড়ি ঘরের লুকজনের সাথে খারাপ আচরন ও বেপরোয়া চলাফেরা দেখে এমনকি বাড়ি,ঘরে খারাপ পুলাপালের আনাগোনা দেখেন চাচা গৌতম পান্ডে।

তিনি এসব নিষেধ করলে আপন চাচা গৌতম পান্ডেকে রামদা নিয়ে খুন করার জন্য দৌড়িয়ে নিয়ে যায় অনিক।পরে এলাকাবাসী গৌতম পান্ডেকে বাচান তার হাত থেকে।এলাকার লুকজন অনিকের দাদা মুক্তিযোদ্ধা দুলন বাবুর হাতিরে কোন কিছু না বলার কারনে দিন দিন তার অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলছিল।
এমনকি সকল অপরাধীদের বলে বেড়াতো তাদের বাড়িতে কোনদিন পুলিশ ডুকবেনা.!

তার আপন বড় ভাই পুলিশ ও দাদা মুক্তিযোদ্ধা দুলন বাবুর বাড়ি এটা থানা পুলিশসহ সবাই চিনেন।তাই সকল অপরাধীরাও নিরাপদ আস্তানা গড়ে তুলে এই বাড়িতে আর অনিকের ঘরে বসে সকল প্রকার অপরাধ চালিয়ে যায় নির্বিঘ্নে।
এমন তথ্য পেয়ে নজরদারিতে রাখে থানা পুলিশ
গোপন সংবাদ খবর পায় পুলিশ,বর্তমানে পলাতক থাকা ইয়াবা ব্যাবসায়ী মনিরসহ ৪/৫জন মিলে ইয়াবা ব্যাবসা চালাচ্ছে ও সেবন করছে অনিকের ঘরে।

এঘটনায় বানিয়াচং থানায় একটি মামলাও হয়েছে। এই মামলা থেকে তার আপন বড় ভাই অভিজিৎ পান্ডে পুলিশে নিয়োজিত থাকা অবস্থায় বানিয়াচং থানা পুলিশকে নিজের পরিচয় দিয়ে তার ছোট্ট ভাইকে ভাল হওয়ার সুযোগ দেওয়ার জন্য অনুরোধ করে বানিয়াচং থানায় হাজীর করে। পরে বানিয়াচং থানা পুলিশ ভাল হওয়ার সুযোগ দিয়ে এই মামলায় তার নাম জড়ায়নি বলেও অনিক পান্ডে প্রচার করে এমনকি আজ লুকমুখেও শুনা যায় এসব কথা।

এদিকে রাত ১ টা ৭ মিনিটে নিহত জোনাকির মা হেনা বেগম জানায়, তার মেয়ের লাশ বানিয়াচং থানায় পরে থাকাতে তিনি লাশের পাশে আছেন তার পুত্র সন্তান ও খালাতো ভাইদের নিয়ে।

(২৫ অক্টোবর) রবিবার সকালে তার মেয়ের লাশ ময়না তদন্তের জন্য হবিগঞ্জ নিয়ে যাওয়া হবে। বানিয়াচং থানার ওসি সাহেব নাকি তারে এই ঘটনায় একটি অভিযোগ দিতে বলছেন। তাও এই গভীর রাতে ১টার পরে থাকে অভিযোগ দেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন আমার দস্তখত নেওয়া হচ্ছে বিভিন্ন কাগজে ও আমার নাম, ঠিকানা লেখা হচ্ছে। এমনকি আটককৃত আমার মেয়ের খুনী অনিক পান্ডেকে একটি রুমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়াও তিনি বলেন তার মেয়ের শরীরে অনেক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং কানে একটি কলম ডোকার মতো ছিদ্র দেখতে পেয়েছেন। এই আঘাতের চিহ্ন গুলি পুলিশ নিজেও দেখছেন বলেন হেনা বেগম। এছাড়া খুনী অনিক পান্ডে এই লাশটি নিয়ে নেত্রকোনা থেকে এসেছে বলে স্বীকার করেছে পুলিশের কাছে। তিনি এসব কথা শুনেছেন বলেন।এছাড়াও পুলিশের কাছে অনিকের পরিবারের সবাই নেত্রকোনা আছে বলেও জানায়। পরে তিনি পুলিশের কথায় মামলার অভিযোগ লিখিয়ে দিছেন কিনা জানতে চাইলে, তিনি বলেন এখনো দেই নাই।

পরে রাত ২টা ৫৬মিনিটে নিহত জোনাকির ভাই সাগর জানায়, তার মা বাদী হয়ে অনিক পান্ডেকে প্রধান আসামী করে এবং গং আসামী দিয়ে একটি হত্যা মামলার লিখিত এজাহার দিয়েছেন।
এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষ খুনি অনিক পান্ডের বিচার দাবী করে ফাঁসি চেয়েছেন ও এই খুনের ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনার জোরদাবী জানিয়েছেন।

এছাড়া এমন কথাও বলতে শোনা যায়, যদি আজ হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি মেয়েকে কোন মুসলমান ছেলে মেরে রাস্তায় ফেলে চলে যাওয়ার চেষ্টা করে আটক হতো।

এতো সময়ে তারা যে কি করতো বলা বাহুল্য ছিল। এমনকি পরের দিন থানা ঘেরাও শহীদ মিনারে মানব বন্ধনসহ সারা বাংলাদেশে বিচারে দাবীতে উত্তাল করে ফেলতো বানিয়াচং উপজেলা।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর