• E-paper
  • English Version
  • বৃহস্পতিবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২১, ০৪:২৬ পূর্বাহ্ন

হবিগঞ্জে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মসজিদ ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের ভুয়া কেন্দ্র দিয়ে কোটি টাকা লুটপাট

স্টাফ রিপোর্টার
  • আপডেটের সময় বুধবার ৩ নভেম্বর, ২০২১

হবিগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর অর্থায়নে মসজিদ ভিত্তিক শিশু, গণশিক্ষা ও বয়স্ক কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র জেলা জুড়ে প্রায় দেড় হাজার আছে। কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে এর অধিকাংশরই কোন অস্তিত্ব নেই।অথচ প্রত্যেকটা কেন্দ্রের শিক্ষকরা প্রতি মাসে নিয়মিত বেতন ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন। বাস্তবে কেন্দ্র এবং শিক্ষা কার্যক্রম চালু না থাকায় একদিকে যেমন সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন প্রিপ্রাইমারি ও কোরআন শিক্ষা থেকে অন্যদিকে সরকারের অপচয় হচ্ছে বছরের লক্ষ-কোটি টাকা।

অনিয়ম প্রান্তিকভাবে নামে-বেনামে শিক্ষা কেন্দ্র নিয়ে লক্ষ কোটি টাকার দুর্নীতি বছরের পর বছর কিভাবে সম্ভব?

এ বিষয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশন এর অফিসে কর্মরত এক স্টাফ নাম না প্রকাশের শর্তে জানান, অস্তিত্বহীন ভুয়া কেন্দ্রের শিক্ষকরা প্রতি মাসে খুব সহজে বেতন ভাতা পাওয়ার মূল কারণ হচ্ছে ফাউন্ডেশনের উপ-পরিচালক শাহ নজরুল ইসলাম। তিনি নিয়মিত প্রত্যেকের কাছ থেকে কমিশন নিয়ে বেতন উঠানোর ফাইলে স্বাক্ষর করে দেন। যার জন্য শিক্ষা কেন্দ্র না থাকার পরেও শিক্ষকদের বেতন ভাতা তুলে নিতে কোন সমস্যা হচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন


এ বিষয়ে শাহ নজরুল বলেন, অনেক কেন্দ্রের শিক্ষকদের বেতনের ফাইলে যাচাই বাছাই না করেই স্বাক্ষর করে দেন। অথচ এই শিক্ষা কেন্দ্র গুলো প্রতিমাসে ফিল্ড অফিসার এবং শাহ নজরুল নিজেও পরিদর্শন করে বেতনের ফাইলে স্বাক্ষর করার কথা।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, হবিগঞ্জ পৌরসভার যশোর আব্দা এলাকায় কাছম আলীর বাংলা ঘরে কাজী মাওলানা আব্দুল জলিল নামের এক ব্যক্তি একটি কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র নিয়ে রেখেছেন। বছরের পর বছর নিয়মিত বেতন-ভাতা উঠালেও, বাস্তবে ওই ঘরে দেয়া হচ্ছেনা কোন ধরনের কোরআন শিক্ষা। যে ঘরটি দেখিয়ে জলিল কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র নিয়েছেন। বাস্তবে ওই ঘরটি খুবই জরাজীর্ণ এখানে বাস করে গরু। তাছাড়া মাওলানা জলিল উমেদনগর জুনিয়র হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সরকারি বিধি মোতাবেক এমপিওভুক্ত কোন শিক্ষক অন্য কোথাও চাকরি করতে পারবে না। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক হয়েও নিজের নামে নিয়ে রেখেছেন একটি কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র।

বিজ্ঞাপন


এ বিষয়ে কাজী মাওলানা আব্দুল জলিলের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, বর্তমানে সে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কোরআন শিক্ষায় চাকরি করছেন না। সদর উপজেলার বহুলা গ্রামের মোকাম বাড়ির কাছে শাহ জামানের বাংলা ঘরে প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা কেন্দ্র ইসামিক ফাউন্ডেসনের অফিসের কর্মচারী জহিরুল ইসলামের মেয়ে মাহমুদা ইহাসমীন এর নামে রয়েছে। বাস্তবে গিয়ে দেখা যায়। কেন্দ্র থাকা দূরের কথা ওইখানে শাহ জামানের বাংলা ঘর নামে কোন ঘরই নাই।

এবিষয়ে মাহমুদা ও তার বাবা জহিরুলকে একাদিক বার কল করলেও তারা ফোন রিসিভ করেননি।

লাখাই উপজেলার দেওয়ান শফিক নামের এক ব্যক্তি, খোয়াই নদীর উত্তর পাড়ে উমেদনগর এলাকায় শেখ তারেক সুমনের বাংলা ঘরে। একটি কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র নিয়ে রেখেছেন।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায় ওই ঘরে অন্য লোক ভাড়া নিয়ে বসবাস করছে। কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রের কোন অস্তিত্ব নেই।এছাড়াও দেওয়ান শফিক তার নিজের ২য় স্ত্রী নামে লাখাই উপজেলায় আরো একটি প্রি-প্রাইমারী শিক্ষা কেন্দ্র নিয়ে রেখেন। অথচ দেওয়ান শফিক তার ২য় স্ত্রীসহ শহরের মোহনপুর এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন।

এ বিষয়ে দেওয়ান শফিকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, তার স্ত্রীসহ তাদের উভয়ের শিক্ষা কেন্দ্র গুলো চালু আছে বলে দাবি করেন।

একাদিক সূত্রে জানা যায়, হবিগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশনে উপ-পরিচালক শাহ নজরুল ইসলাম এর বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলা স্বজনপ্রীতি ও সরকারি রীতিনীতি লঙ্গন করে অবৈধ পন্থায় নিয়োগ প্রদান, এছাড়া গত ২০১৫-২০১৯ সালের ষষ্ঠ প্রকল্পের কোরআন শিক্ষা/ প্রি-প্রাইমারি শিক্ষার মেয়াদ শেষ হলে। পরবর্তীতে শাহ নজরুল কোন ধরনের শূন্য কোটা না দেখিয়ে অবৈধ পন্থায় পূর্বের কেন্দ্র ও শিক্ষকদেরই বহাল রেখে পুনরায় সপ্তম ২০২০-২০২৪ প্রকল্প চালু করে দেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, ২০১৭ সালে তিনি হবিগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সহকারী পরিচালক হিসাবে যোগদান করেন। তার আগে তিনি সিলেট ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় অফিসে প্রশিক্ষণ একাডেমীতে ইসলামিয়াতের শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বরত ছিলেন।

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার হিয়ালা গ্রামে গরিব পরিবারে শাহ নজরুলের জন্ম। কিন্তু ইসলামিক ফাউন্ডেশন চাকরির সুবাদে অবৈধ পন্থায় বর্তমানে সিলেটে বিলাস বহুল বাড়ি ও কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মালিক তিনি। ১৯৯৩ সালে হবিগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশনের গণশিক্ষার প্রকল্পের একজন সুপার ভাইজার হিসাবে নিয়োগ প্রাপ্ত হোন। নজরুল কওমী শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও পরবর্তীতে তিনি কলেজ শিক্ষায় শিক্ষা অর্জন করেন। বিএনপি জামাতের সময় ইসলামিক ঐক্যজোটের ব্যানারে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়ে তিনি অল্প দিনেই সিলেট ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বিভাগীয় অফিসের প্রশিক্ষন একাডেমিতে ইসলামিয়তের শিক্ষক হিসাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হোন। এর সুবাধে তিনি বিভাগীয় অফিসে বিভিন্ন সেমিনার প্রতিযোগিতা সহ বিভিন্ন ধরনের সুবিধা ভোগ করেন।

অভিযোগ রয়েছে বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রশিক্ষণের জন্য ইমামদের খাওয়া দাওয়া কাজের টিকা পাইয়ে দিতে লিয়াজোঁ করতেন তিনি এরবিনিময় নিতেন মোটা অংকের কমিশন। ইমামদের খাবারের বরাদ্দকৃত টাকা থেকে মোটা অংকের কমিশন নেওয়ায় ইমামরা ভালো মানের খাবার পাইতেন না। তখনকার সময়ে ওই এলাকায় তাকে জামাত শিবিরে অলিখিত আমির বলে বিএনপির নেতারা ডাকতেন। ইসলামিক ঐক্যজোট সহ জমাতের সকল অনুষ্ঠানে তার ছিল অবাধ যাতায়াত। এসব কর্মকান্ড করে বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা নিয়ে রাতারাতি সিলেট শহরে করেছেন বিলাসবহুল বাড়ি। বর্তমানে তার পরিবারের লোকজন ওই বাসাতেই বসবাস করছেন। পরিবারের লোকজন স্থায়ীভাবে সিলেট বসবাস করায় শাহ নজরুল অধিকাংশ দিনই অফিস ফাঁকি দিয়ে সিলেট শহরে অবস্থান করেন।হবিগঞ্জ শহরে তার কোনো বাসা নেই। হবিগঞ্জ থাকাকালীন সময়ে রাত্রি যাপন করেন অফিস এর ৪য় তলার গেস্ট হাউসে। প্রতিমাসের বাসা ভাড়া বাবদ প্রায় ১৮ হাজার টাকা সরকারের কাছ থেকে নিলেও অনিয়মতান্ত্রিক ভাবে দিনের পর দিন রাত্রি যাপন করছেন অফিসের গেস্ট হাউসে।

নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে অফিসের গেস্ট হাউসে কেন রাত্রিযাপন করেন এই প্রশ্নের জবাবে শাহ নজরুল বলেন, আমি অফিসের গেস্ট হাউসে থাকি না। হবিগঞ্জ শহরে আমার কিছু আত্মীয় আছেন। তাদের এক একজনের বাসায় আজকে তো কালকে আরেকজনের বাসায় এভাবেই চলছে আমার জীবন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, সিলেট উপ-শহরের মাদ্রাসা জায়িতুল খায়ির প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওই মাদ্রাসাগুলোর প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক শাহ নজরুল নিজেই। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাদের কাছে শাহ নজরুল নিজেকে একজন ইসলামিক বড় পন্ডিত হিসেবে পরিচয় দেন। হবিগঞ্জ ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যোগদানের পরেই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ইমাম সমিতি হবিগঞ্জ জেলা কমিটি ভেঙ্গে দিয়ে নতুন করে ইমাম সমিতি গঠন করেন। কমিটিতে সভাপতি করেন হেফাজতে ইসলাম হবিগঞ্জের আমির মাওলানা সামছুল হক মুসা মিয়াকে। সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করেন মাওলানা আমিনুল হককে। এতে হবিগঞ্জের আলিম উলামাদের মাঝে উদ্যেগ সৃষ্টি হয়। কারণ যাকে সভাপতি করা হয়েছে ওই ব্যক্তি একসময়ের ইসলামিক ঐকজোট ও চারদলীয় বিএনপি জোটের সময় জমিয়তের উলামার পক্ষ থেকে সরকারি দলের সাথে ছিলেন।

অভিযোগ আছে ইমাম সমিতির বর্তমান সভাপতি কোন ধরনের রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শহীদ মিনারে যান না।আর যাকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়েছে মাওলানা আমিনুল হক। তার দেশের বাড়ি কুমিল্লা। বর্তমানে তিনি বসবাস করছেন হবিগঞ্জ সদর উপজেলার কাশিপুর নানার বাড়িতে। লেখাপড়ায় দাখিল পাস হলেও সমালোচনা রয়েছে তিনি দাওরা পাস জাল সনদ দিয়ে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের শ্রেষ্ট ইমাম হয়েছেন। জাতীয় পর্যায়ে বাচাইয়ে তিনি নিজেকে শ্রেষ্ট ইমাম হিসাবে নির্বাচিত করতে সক্ষম হন।

মাওলানা আমিনুল হক তথ্য গোপন করে তখনকার মহা-পরিচালক মৃত শামীম আফজালকে ম্যানেজ করে নিজেকে শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে নেন। যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি সব ধরনের সুযোগ সুবিধা উপভোগ করছেন।ইতিপূর্বে বেশ কয়েক বার হজ্বও করেছেন। বর্তমানে শাহ নজরুলকে ম্যানেজ করে বহুলা গ্রামে ফাতেমা (রাঃ)জামে মসজিদে তার নিজের নামে একটি কোরআন শিক্ষা কেন্দ্র নিয়ে রেখেছেন। এছাড়া তার বোন আলিফ চান বিবির নামে কাশিপুরে রয়েছে আরে একটি প্রি-পাইমারি শিক্ষা কেন্দ্র। যদিও কয়েক বছর পূর্বে তার বোন আলিফ চান বিবির বিবাহ হয়ে গেছে কিন্তু ইমাম সমিতির সাধারণ সম্পাদক মাওলানা আমিনুল হক শাহ নজরুলকে কমিশন দিয়ে এখনো প্রতিমাসে বোনের কেন্দ্রের বেতন উত্তোলন করে নিচ্ছেন।

এ বিষয়ে মাওলানা আমিনুল হক জানান, তার কোরআন শিক্ষা কেন্দ্রটি চালু আছে এবং তার বোনের প্রি-প্রাইমারি শিক্ষা কেন্দ্রটির বিষয়ে বলেন বাড়ির পাশে বিয়ে হওয়ায় তার কেন্দ্রটি বিয়ের পরেও চালু আছে।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর