• E-paper
  • English Version
  • শুক্রবার, ২৮ জানুয়ারী ২০২২, ০২:১৫ পূর্বাহ্ন

ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জনপ্রতিনিধি ও জনতার করনীয়

অকেয়া হক জেবু
  • আপডেটের সময় শুক্রবার ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১

ভূমিকা: ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে
“God made the village, and man made the town.”
অর্থাৎ বিধাতা সৃষ্টি করেছেন গ্রাম আর মানুষ তৈরি করেছে শহর। প্রকৃতির সাথে সন্ধি করে গড়ে ওঠে গ্রাম। কয়েকটি গ্রাম নিয়ে গঠিত হয় ইউনিয়ন পরিষদ যা স্হানীয় সরকার নামে পরিচিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রাচীনতম প্রতিষ্টান ইউনিয়ন পরিষদ। যার বয়স ১৪২ বছর। ইউনিয়ন পরিষদ হল পল্লী অঞ্চলের প্রশাসনিক একক। গ্রাম চৌকিদারি আইন ১৮৭০ এর অধীনে ইউনিয়ন পরিষদ সৃষ্টি হয়। ১৯১৯-১৯৩৫ সালে পরিবর্তন করে নামকরন করা হয় ইউনিয়ন বোর্ড। ১৯৭২ সালে এসে পুনরায় নামকরন করা হয় ইউনিয়ন পঞ্চায়েত। সর্বশেষ ১৯৭৩ সালে এসে রাষ্ট্রপতির আদেশ বলে নামকরন করা হয় ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদ হচ্ছে জনগনের প্রতিষ্ঠান। বাংলাদেশে বর্তমানে ৪৫৭১ টি ইউনিয়ন পরিষদ রয়েছে।

নির্বাচন: বাংলাদেশের নির্বাচন একটা উৎসব। দল বেঁধে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার একটা রীতি বহু কাল ধরে চলে আসছে। নির্বাচন এলে এলাকায় একটা আবহ তৈরি হয়। কর্মব্যস্ত মানুষগুলো চলে যায় নিজ নিজ এলাকায় যোগ্য প্রতিনিধি নির্বাচনে অংশ নিতে। জনপ্রতিনিধি তার সঠিক ক্ষমতা ব্যাবহার করে, সঠিক নেতৃত্ব দিয়ে জনগনের মন প্রান আকৃষ্ট করে। সুনাগরিকের তিনটি বৈশিষ্ট্য- বুদ্ধি, বিবেক ও আত্মসংযম এই তিনটি গুনাবলি দিয়ে সুক্ষ্ম বিচার বিশ্লেষণ করে জনপ্রতিনিধি জনতার উন্নয়ন মূলক কাজ ত্বরান্বিত করে।

নির্বাচনের পূর্বে জনপ্রতিনিধির করনীয়: নির্বাচনের পূর্বে জনপ্রতিনিধির জন্য বিশেষ কিছু করণীয় রয়েছে বলে মনে করি যা অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। নিম্নে সংক্ষিপ্তভাবে আলোকপাত করা হলো –

জনসাধারণকে মিথ্যা আশ্বাস না দেওয়া: নির্বাচনের পূর্বে জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সভা সমাবেশ করে জনসাধারণের মন আকৃষ্ট করার জন্য অনেক মিথ্যা আশ্বাস বা নীতি বাক্য শুনিয়ে থাকেন কিন্তু নির্বাচনের পর তা বাস্তবায়ন হতে দেখা যায় না। এতে জনসাধারণ প্রতারিত হয়। সুতরাং একজন জনপ্রতিনিধি কোন ভোটারকে অবশ্যই মিথ্যা আশ্বাস দেয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

অবৈধ ভাবে ভোটারদের সাথে অর্থ লেনদেন না করা: বর্তমানে অবৈধ টাকার পাহাড় গড়া লোকগুলো জনপ্রতিনিধি হওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। রাতের আঁধারে বা সঙ্গোপনে টাকার বিনিময়ে ভোট কেনা শুরু হয়। এ যেন ক্রেতা বিক্রেতার মাঝে ধর কষাকষির এক মহা-বানিজ্য। টাকার বিনিময়ে ভোট লেনদেন বিষয়টা থেকে জনপ্রতিনিধি দূরে থাকতে হবে।

বিরোধী পক্ষের সাথে সদয় ব্যাবহার করা: একজন যোগ্য জনপ্রতিনিধির উচিত বিরোধী পক্ষকে শত্রু না ভেবে তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ন আচরন করা। সুন্দর এবং সুষ্ঠু ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা।

অহেতুক বিশৃঙ্খলা করা থেকে বিরত থাকা: বর্তমান সময়ে প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে দেখা যায় বিশৃঙ্খলায় ভরপুর। যে কোন কথার জেড় ধরে এক পক্ষ অপর পক্ষের সাথে শুরু হয়ে যায় মারামারি, ঝগড়া বিবাদ। আহত এবং নিহত হয় অনেক মানুষ। একজন জনপ্রতিনিধিকে অবশ্যই নজরে থাকতে হবে যে- কোনভাবেই যেন নিজের সমর্থকদের কারণে নির্বাচনে কোন ধরণের বিশৃঙ্খলা না হয়। নির্বাচনকে উৎসব মনে করে সুশৃঙ্খল ভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে।

শান্তিপূর্নভাবে নির্বাচনি প্রচারনা: প্রায়ই দেখা যায় নির্বাচনি প্রচারনা করতে গিয়ে এক পক্ষ আরেক পক্ষের বিরুদ্ধে অপ্রীতিকর বক্তব্য, উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে এক পক্ষ আরেক পক্ষের সাথে বিরোধ সৃষ্টি করে। বিভিন্ন যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণায় এক পক্ষ অপর পক্ষের প্রতি অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ এবং মানহানিকর বক্তব্য প্রকাশ করে। তাই জনপ্রতিনিধির উচিত এসব প্রচারনা থেকে দূরে থেকে শান্তিপূর্ন ভাবে নির্বাচনী প্রচারনা করা।

নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে নির্বাচন কমিশনের দিক নির্দেশনা মেনে চলা: সুন্দর সুষ্ট এবং উৎসব মুখর নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের পূর্ববর্তী সময়ে যে দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকে তা যথাযথ ভাবে মেনে চলা।

নির্বাচনের পরে জনপ্রতিনিধির করনীয়: জনগন তাদের পছন্দ অনুযায়ী যোগ্য প্রার্থী নির্বাচিত করবেন তাদের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে। জনপ্রতিনিধির উচিত নির্বাচনের পূর্বে দেওয়া প্রতিটা ইশতেহার বাস্তবায়ন করা। ইউনিয়ন পরিষদের সকল কাজের কেন্দ্র বিন্দু হলেন চেয়ারম্যান। এক কথায় পৌর উন্নয়ন, রাজস্ব, প্রশাসন সহ ইউনিয়নের সব ধরণের কাজ তদারকি করার দায়িত্ব চেয়ারম্যানের। তম্মধ্যে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয় সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো –

ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান গ্রাম পুলিশের সহায়তায় এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা করেন। বিভিন্ন সময়ে ঘোষিত সরকারী আইন ও সার্কুলার অনুযায়ী অর্পিত অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পালন করেন চেয়ারম্যান।

এলাকার অপরাধ দমন, শান্তি শৃঙ্খলারক্ষা এবং দাঙ্গা-হাঙ্গামা প্রতিরোধ করার জন্য চেয়ারম্যান থানার ভারপ্রাপ্তকর্মকর্তার নিকট থেকে সহযোগিতা গ্রহণ করেন। কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারী বা সংক্রামক রোগ এবং ফসলে পোকার আক্রমণ দেখা দিলে চেয়ারম্যান উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। ইউনিয়নে কৃষি, মাছচাষ, পশু পালন ও বনজসম্পদ উন্নয়নের জন্য তিনি স্থানীয় কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করে এলাকার জনসাধারণকে সহায়তা করেন। পরিবার পরিকল্পনা কর্মীদের সহায়তা করেন এবং এ বিষয়ে জনসাধারণকে উদ্বুদ্ধ করেন।

উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে – রাস্তা, খাল, সাঁকো তৈরি ও মেরামতের জন্য চেয়ারম্যান স্থানীয় পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করেন। পল্লীপূর্ত কর্মসূচী এবং কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীসহ অন্যান্য কর্মসূচীর মাধ্যমে খাল খনন, পুনঃখনন এবং ভৌত অবকাঠামো তৈরিতে চেযারম্যান সহযোগিতা করেন। রাস্তার পাশে বাতি জ্বালানো, গাছলাগানো, এলাকা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, পুকুর ও খালবিলের কচুরিপানা পরিস্কার এবং সরকারী জমি ও সম্পত্তি রক্ষা করার ব্যবস্থা করেন চেয়ারম্যান। তিনি যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নেও ভূমিকা রাখেন।

বিচার বিষয়ক কার্যাবলীর মধ্যে চেয়ারম্যান গ্রাম আদালতের চেয়ারম্যান হিসেবে বিভিন্ন মামলা মোকদ্দমা নিস্পত্তি করেন। চেয়ারম্যান ছোটখাট ঝগড়া-বিবাদ, দাংগা-হাংগামা ও জমিজমা সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় ব্যক্তিগত উদ্যোগে সালিশের মাধ্যমে নিস্পত্তি করেন।

এছাড়াও চেয়রম্যান জন্ম-মৃত্যু এবং মৃত ব্যক্তির পোষ্য সংক্রান্ত উত্তরাধিকার, জাতীয়তা ও চারিত্রিক সনদ পত্র প্রদান করেন। রিলিফ সামগ্রী বিতরণ, চিকিৎসার জন্যরোগীদের স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ প্রদান, বন্যা ও মহামারী নিয়ন্ত্রণ, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধের ব্যবস্থা করেন। খাস জমি বন্টন ও ভূমিহীন কৃষক চিহ্নত করেন।

জনতার করনীয়: নির্বাচনের ফলাফলে একটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়- কালো টাকার মালিক বা দুর্নীতিবাজরা নির্বাচিত হচ্ছে। অর্থনৈতিক অবস্থা, শিক্ষা, নাগরিক অধিকার ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে ভোটাররা অসচেতন থাকার কারণেই এমনটি ঘটছে।
আজকাল ভালো প্রার্থী পাওয়া দুষ্কর। অথচ জনগণ চায় সৎ, শিক্ষিত, চরিত্রবান, আদর্শবাদী ও সমাজসেবার মানসিকতাসম্পন্ন যোগ্য মানুষ জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত হোক। বস্তুত যারা সুখে-দুঃখে জনগণের পাশে থাকবে, কেবল তারাই জনপ্রতিনিধি হওয়ার অধিকারী।

এলাকার রাস্তাঘাটের উন্নয়ন, যোগাযোগ, শিক্ষা, কৃষি ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় বলিষ্ঠ ভূমিকা পালনে সক্ষম ব্যক্তিকেই ভোট দেয়া কর্তব্য বলে মনে করা উচিত। যারা ঘুষ খায়, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য পায়ে ধরে, ক্ষমতায় গেলে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার করে, তাদের বর্জন করতে হবে।

ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে-
Education is the backbone of a nation. অর্থাৎ শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষিত জাতি গড়ার জন্য জনপ্রতিনিধিকেও শিক্ষিত হতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই যে বিভিন্ন সময় সমাজের মানুষ কলো টাকার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়ে অসৎ এবং অশিক্ষিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করে এবং ইউনিয়নের দায়িত্ব দেয়। তাই জনতার উচিত যার ভেতর জ্ঞানের আলো বিরাজমান তাকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা। আলোতে পথ চলা সহজ। আর সেটা যদি জ্ঞানের আলো হয় তাহলে সে নিজে আলো জ্বালিয়ে সমাজকেও আলোকিত করতে পারবে।

নেপোলিয়নর বলেছেন – If you give me a good mother, I will give you a good nation. অর্থাৎ – আমাকে একজন শিক্ষিত মা দাও, আমি তুমাদের একটা শিক্ষিত জাতি উপহার দেব। ঠিক তেমনি জনতার উচিত একজন শিক্ষিত জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা। যে জনপ্রতিনিধি একটা শিক্ষিত সমাজ উপহার দিতে পারবে।

তাই ২০২১ সালে জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে করনীয় হচ্ছে শিক্ষিত, সৎ, আদর্শবান, মানবসবী, সেচ্ছাসেবী, উদার মনমানসিকতা সম্পন্ন এবং যে সমাজ ব্যাবস্থার উন্নয়ন গঠিয়ে সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে, তাকেই উচিত জনতার জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করা।

উপসংহার: একটি ইউনিয়ন পরিষদের রুপচিত্র এবং উন্নয়ন মূলক কর্মকান্ডেই বুঝা যায় সেই এলাকার জনপ্রতিনিধি কেমন। আয়নায় যেমন নিজের চেহারা দেখা যায় ঠিক তেমনি জনপ্রতিনিধির কর্মকান্ডেই তার চরিত্র, স্বভাব, যোগ্যতা এবং সঠিক নেতৃত্ব ফুটে ওঠে। জনসাধারণের উচিত, প্রতিনিধি নির্বাচন কালে তাদের সততা, দক্ষতা ও জনগণকে মূল্যায়নের সক্ষমতা বিবেচনায় এনে সৎ ও আদর্শবান ব্যক্তিকে মূল্যবান ভোট দিয়ে নির্বাচিত করা। যার দরজা শুধু দলীয় নেতাকর্মীদের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্যও খোলা থাকবে; যিনি রাজনৈতিক সহাবস্থানে বিশ্বাসী হবেন। সবার কথা ভাববেন। একইসঙ্গে সৎ, যোগ্য, দেশপ্রেমিক ও নিবেদিতপ্রাণ মানুষ হবেন।

স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতিতে জড়িত কোন ব্যক্তিকে নির্বাচিত করা থেকে বিরত থাকতে হবে। মনে রাখতে হবে- ন্যায়পরায়ণ, বিবেকবান, আদর্শবান, নীতিনিষ্ঠ, সমাজ উন্নয়নে নিবেদিত ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় ব্যক্তিরা জনপ্রতিনিধি হলে দেশ ও জাতি উপকৃত হবে।
তাই বলতে ইচ্ছে করে-
“জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে জনতার করনীয়,
অশিক্ষিত, অসৎ, দুর্নীতিবাজ ২০২১ সালের নির্বাচনে বর্জনীয়।”

লেখক: কবি ও আইনজীবী (হবিগঞ্জ জজকোর্ট)
থানাঃ লাখাই
জেলাঃ হবিগঞ্জ


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর