শ্যামনগরে অনুষ্ঠিত হল সুন্দরবনের দেবী বনবিবির পূজা সহ মেলা

রনজিৎ বর্মন (শ্যামনগর) সাতক্ষীরা
  • আপডেটের সময় রবিবার ১৬ জানুয়ারী, ২০২২

সুন্দরবনের দেব—দেবীর মাহাত্ম্য বর্ণনায় প্রথমেই যার কথা উল্লেখ করতে হয় তিনি বনবিবি। প্রতি বছর মাঘ মাসের প্রথম সপ্তাহে অনুষ্ঠিত হয় বনবিবি পূজা ও মেলা। সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার মুন্সিগঞ্জ ইউপির জেলেখালী, রমজাননগর ইউপির কালিঞ্চি গ্রামে, বুড়িগোয়ালিনী ইউপির পানখালী গ্রামে, গোলাখালী গ্রামসহ সুন্দরবন সংলগ্ন কয়েকটি স্থানে মাঘ মাসের ১ তারিখে বনবিবি পূজা ও মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

পূর্ব জেলেখালী গ্রামের নীলকান্ত ফকিরের পুত্র সতিশ ফকির বর্তমানে নিজ উদ্যোগে এই বনবিবির পূজা করে আসছেন।

শনিবার মেলার এক দর্শণার্থী অরবিন্দ মন্ডল ও মেলা আয়োজক কমিটির সদস্য ভবতোষ মন্ডল বলেন, গ্রামের এই বনবিবি মেলার বয়স ১৪০ বছর হতে চলেছে। তসিকা ফকিরের ঠাকুরদা যজ্ঞেশ্বর মন্ডল। আর যজ্ঞেশ্বর মন্ডলের ছেলে নীলকান্ত মন্ডল এবং নীলকান্ত মন্ডলের ছেলে সতীশ মন্ডল এই বনবিবির পূজা করে আসছেন। বংশ পরম্পরায় ধারাবাহিকভাবে অদ্যাবধি বনবিবি পূজা ও মেলা চলছে। তবে এ মেলা সপ্তাহব্যাপী বা তারও বেশি দিন স্থায়ী হতো।

মেলার দর্শনার্থী তাপষ মন্ডল, শিক্ষক বিনতা রানী, সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুল জলিল কাগুজী বলেন, পূর্বে মেলা উপলক্ষে যাত্রা, পুতুলনাচ, নাগরদোলা এসব বসত। এখন এক দিনে মেলা শেষ হয়।

শনিবার জেলেখালী অনুষ্ঠিত বনবিবির মেলায় মুন্সিগঞ্জ ইউপি চেয়ারম্যান অসীম কুমার মৃধা, ইউপি সদস্য দেবাশিষ গায়েন, সংরক্ষিত ইউপি সদস্য রুপা রানী সহ অন্যান্য সদস্যবৃন্দ অতিথি হিসাবে বক্তব্য রাখেন এবং দর্শনার্থীদের মতবিনিময় করেন।

মেলার প্রধান কর্তা সতীশ মন্ডল বলেন, বনবিবির পূজা ও মেলার বয়স প্রায় দেড়শত বছর হলেও আজও মন্দিরটি পাকা করতে পারিনি। সরকারি সহায়তার জন্য তিনি কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি কামনা করেন। কালিঞ্চি গ্রামের তথা পূজাকমিটির সভাপতি হরিপদ মন্ডল বলেন, তাদের এ বনবিবির মেলা বহুদিন আগে থেকে হয়ে আসছে। তবে স্থানাভাবে মেলার ব্যাপ্তি কম। বনবিবি নামকরণের মধ্যে রয়েছে হিন্দু—মুসলমান সংস্কৃতির সমন্বয়।

জেলেখালী পূজা অনুষ্ঠানের প্রধান কর্তাব্যক্তি সতিশ ফকির/মন্ডল জানান, জল আর জঙ্গল মিলিয়ে সুন্দরবন। এর কোল ঘেঁষে বাস করে পরিশ্রমী মানুষ। তারা এই বনবিবিকে অতি আপনজন মনে করে বিপদে—আপদে স্মরণ করে থাকেন। বিশেষ করে সুন্দরবন—নির্ভর জনগোষ্ঠী। স্থানীয়দের বিশ্বাস, বনবিবি সুন্দরবনে যত্রতত্র যাতায়াত করেন। বাঘ—কুমিরসহ সমগ্র হিংস্র জন্তু তার অনুগত।

এদিকে গাজী সুন্দরবনের জেলে—বনজীবীদের কাছে মৌলিক দেবতা। হিন্দু—মুসলমান সবাই তাকে স্মরণ করেন। গাজীর মুখে দাড়ি, পরনে লুঙ্গি, ঘাড়ে গামছা। দক্ষিণরায় বাঘের দেবতা হিসেবে পরিচিত। বনবিবির পূজা কোনো ব্রাক্ষ্মণ ছাড়াই ভক্তরা পুঁথি পড়ে পূজা বা শিন্নি দেন। পূজার কোনো ধরাবাঁধা নিয়ম খুঁজে না পাওয়া গেলেও বনবিবির নামে এই পূজায় বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট বনবিবির আকৃতির প্রতিমা নিয়ে বাদ্যবাজনাসহ এসে মানত দিতে দেখা যায়।

পূজার কর্তাব্যক্তিরা বলেন, প্রতিবছর বহুসংখ্যক লোক মানত দেন, এমনকি সন্তান—সন্ততি না হলে মানত করেন এবং সন্তান—সন্ততি হলে বনবিবির প্রতিমাসহ মানত দেন। জেলে—বাওয়ালী, মৌয়ালীরা সাধারণত বনবিবির পূজা বা শিন্নি দিয়ে জঙ্গলে উঠেন। পূজার প্রসাদ বাতসা, চিনি ও ফল প্রভৃতি।

সুন্দরবন সংলগ্ন এই অতীত সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য বনবিবি মেলা বা বনবিবি পূজা ধরে রাখা প্রয়োজন বলে এলাকার সংস্কৃতিপ্রেমীরাসহ প্রবীনরা মনে করেন।


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর