• E-paper
  • English Version
  • বৃহস্পতিবার, ১৯ মে ২০২২, ০১:১৬ পূর্বাহ্ন

দ্বীপাঞ্চল মহেশখালীতে বিলুপ্তির পথে সাদা বক, জীব বৈচিত্র্য হুমকির মুখে

সুব্রত আপন, মহেশখালী
  • আপডেটের সময় বুধবার ২০ এপ্রিল, ২০২২

কক্সবাজার জেলার উত্তর-পশ্চিমে বঙ্গোপসাগরের তীর ঘেঁষে দ্বীপটি অবস্থিত দ্বীপ উপজেলা মহেশখালী। এই দ্বীপের দক্ষিণ-পশ্চিমে সোনাদিয়া, উত্তর-পশ্চিমে ধলঘাটা ও মাতারবাড়ি নামে আরও দুটি ছোট দ্বীপ। কবিতার চরণের ন্যায় প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সাজানো এই দ্বীপটিতে বিভিন্ন প্রজাতির জীব-বৈচিত্রের সমাহার ছিলো চোখে পড়ার মতো। এ যেন শিল্পীর নিখুঁত হাতে অতি যত্নে আঁকা একখণ্ড সবুজ চিত্রশালা। সেই সৌন্দর্যের অন্যতম নিদর্শন ছিল ধবধবে সাদা বক। নিরূপায় হয়ে খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সাদাবকের দল দ্বীপাঞ্চল থেকে তাদের আবাস্থল ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাতে শুরু করে। এখন তেমন একটা বকের দল দেখা যায় না। মাঝেমধ্যে গুটি-কয়েক সাদা বকের দেখা মিলে।

“ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ। ঐ খানেতে বাস করে কানা বগীর ছা।” ছোট বেলায় পাঠ্যবইয়ের পাতা উল্টিয়ে যখন কবিতার চরণগুলো পড়তাম, তখন গ্রামের খাল-বিলের ধারে একদল সাদা বক খেলা করছে, এমন দৃশ্য ভেসে ওঠতো। এই তো কয়েক বছর আগেও ছিল সাদা বকের বিচরণ। সকাল বেলা পুকুর পাড়ে, বিল ও খালের ধারে, ক্ষেতের পাশে শিকারের অপেক্ষায় নিশ্চুপ বসে থাকা সাদা বকটিকে দেখে মনের অজান্তেই ভাল লাগা শুরু হতো। মিনিটপাঁচেক অপেক্ষার পর সাদা বকটি টোপ করে তার লম্বা ঠোঁটে পুঁটিমাছ শিকার করে নিতো। আর তখনই কল্পনায় আঁকা মনোরম জ্যান্ত ছবিটি দেখার সুযোগ হতো।

ঘড়ির কাঁটায় বিকেল ৪ টা। ট্রলার নিয়ে সোনাদিয়া (দ্বীপ) থেকে ঘটিভাঙ্গা গ্রামে ফিরছিলাম। দু’পাশে সবুজ প্যারাবন। মাঝখানের নীল রঙের খাল বেয়ে ট্রলার চলছে। খালের মোহনা পার হচ্ছিলাম। ঠিক তখনই প্যারাবনের ধারে শিকারের অপেক্ষায় বসে থাকা সাদা বকটির ওপর নজর পড়লো। মনে হচ্ছে কতটা দুঃখ, বেদনা, রাগ আর অভিমান নিয়ে নীরবে বসে আছে । অনেকটা নীরব প্রতিবাদের মত। মনে হচ্ছিলো বকটি চিৎকার করে বলছে- এই দ্বীপের পরিবেশে চরম বিপর্যয় ঘটেছে। দ্বীপে অনবরত পাহাড় কাটা, বালি উত্তোলন, গাছ কাটা, খাল-বিল, পুকুর ও জলাশয় ভরাটসহ নানাবিধ পরিবেশ দূষণীয় কাজ করায় তার সঙ্গীরা এক-এক করে আবাস্থল ছাড়ছে। কেউ বা শিকারির হাতে পড়েছে, আবার কেউ বা মৃত্যু নামক যন্ত্রনায়। যদিও সাদা বকটির ভাষা বুঝার সক্ষমতা মানুষের নেই।

বাংলাদেশে ১৮ প্রজাতির বক রয়েছে। যার মধ্যে পাঁচটি বগা (ছোট বগা, মাঝলা বগা, প্রশান্ত শৈল বগা, বড় বগা ও গো বগা), ৯টি বক (ধুপনি বক, দৈত্য বক, ধলপেট বক, লালচে বক, চীনাকানি বক, দেশি কানি বক, কালোমাথা নিশি বক, মালয়ী নিশি বক, ক্ষুদে নিশি বক) এবং চারটি বগলা (খয়রা বগলা, হলদে বগলা, কালা বগলা, বাঘা বগলা)। আকারে বক ৪৫ থেকে ১৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়ে থাকে। এদের পা ও লম্বা ঠোঁট ছাড়া সারা দেহ সাদা পালকে আবৃত। বক একসঙ্গে তিন থেকে সাতটি ডিম দেয়। ডিম দেওয়ার সপ্তাহের ভেতর ডিম ফুটে বাচ্চা হয়। বক সাধারণত মাছ ও পোকামাকড় বেশি খায়। ফসলের পোকা খেয়ে কৃষকের অনেক উপকার করেন। অন্যান্য বন্য প্রাণির মতো বকও বিলুপ্তির পথে। ফলে পরিবেশের ভয়াবহতা দিনদিন বেড়ে চলেছে।

স্থানীয় পরিবেশকর্মী দিনুর আলম বলেন, প্রাকৃতিক নান্দনিক পাখি বকের কলরব এখন শুধু স্মৃতি হয়ে যাচ্ছে। বন উজাড় এবং অসাধু শিকারির দৌরাত্ম্যে সাদা বক দিন দিন হারিয়ে যেতে বসেছে। বিশেষ করে খাবারের খোঁজে মাছের প্রজেক্টে আসলে, শিকারিদের ফাঁদে আটকা পড়ে এসব বক।

মহেশখালী বনবিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনিসুর রহমান বলেন- “এই অঞ্চলে বক সংরক্ষণের কোন প্রজেক্ট নেই। তবে বক বিলুপ্তি পরিবেশের ক্ষতির বার্তা দেয়। বিষয়টি নিয়ে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করা হবে।”


এই ক্যাটাগরিতে আরো খবর